হোমআঞ্চলিক

"অনেকে ‘লড়াই’ বলে বটে, তবে আমার কারও সঙ্গে লড়াই নেই": প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়

  | October 13, 2018 08:53 IST
Kishore Kumar Junior

NDTV Bangla’র মুখোমুখি প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। কথা বললেন বাংলা ছবি, মঞ্চ ও কণ্ঠী নিয়ে। শুনলেন বোধিসত্ত্ব ভট্টাচার্য। আজ সাক্ষাৎকারটির অন্তিম পর্ব।  

তাঁর স্তম্ভের মতো দৃঢ় কাঁধটিতে ভর দিয়ে বাংলা ছবি এগিয়ে গিয়েছে দশকের পর দশক। কুড়ি বছর আগের মতোই এখনও তাঁর নামেই ভরে যায় হল। গ্রামবাংলায় শো করতে গেলে দূরদূরান্ত থেকে যেন এক হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালাকে দেখতেই ছুটে আসে অগণিত মানুষ। বহু আঘাত, অপমান ও বিপুল রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর এখনও রয়ে গিয়েছেন বাংলা ছবির ‘অবিসংবাদী সম্রাট’ হয়েই। সময়ের হাত ধরে আসে যে বদল, তিনি রয়ে গিয়েছেন সেই বদলটিকে হাসিমুখে অভ্যর্থনা জানিয়েই। NDTV Bangla’র মুখোমুখি প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। আজ কথা বললেন কণ্ঠী, মঞ্চের পারফরমেন্স এবং সর্বোপরি বাংলা ছবি নিয়ে। শুনলেন বোধিসত্ত্ব ভট্টাচার্য। আজ সাক্ষাৎকারটির দ্বিতীয় তথা অন্তিম পর্ব।   

[সাক্ষাৎকারটির প্রথম পর্ব: "গত দশ বছরে বাংলা ছবি সেই ব্যবসা দিতে পারেনি, যা অঞ্জন চৌধুরী দিয়েছিল": প্রসেনজিৎhttp://movies.ndtv.com/bengali/kishore-kumar-junior-an-interview-with-tollywood-superstar-prosenjit-chatterjee-1928948]

আপনি দীর্ঘদিন ধরে শো করে এসেছেন। যেটাকে একদম সাদা বাংলায় ‘মাচা’ বলে ডাকা হয়। যে শো’তে আপনি থাকবেন, সেখানে আপনাকেই প্রাধান্য দেওয়া হবে বেশি, সেটা একদম পরিষ্কার সত্য। এই প্রাধান্য পাওয়ার জায়গাটিতে দাঁড়িয়ে কখনও এইসব শো’তে কণ্ঠীদের যে দুর্দশাগুলো পোহাতে হয়, তা চোখে পড়েছে?


 


দেখুন ভিডিও:

ভীষণভাবে পড়েছে। দেখো, আমি যত বড় তারকাই হই না কেন, দিনের শেষে তো একজন মানুষ। সেই মানবিকতার জায়গা থেকে দেখলে এই দুর্দশার ছবিটা স্পষ্টভাবেই চোখে পড়বে। কেউ কেউ আছেন যারা সারা বছরই কণ্ঠী হিসেবে গান গেয়েই রোজগার করেন। তবে, সবাই তো সেরকম নন। বেশিরভাগই নন। তাঁরা অন্য কোথাও কাজ করেন। গান গাওয়ার বরাত পেলে সেই কাজ শেষ করে গানটা গাইতে আসেন। কাজের জায়গার পোশাকটা ছেড়ে যখন গান গাওয়ার পোশাকটা গায়ে চাপিয়ে নেন, তখন তাঁরা নিজের কাছেই নিজে আরও একটু ঝলমলে। আরও একটু প্রাণবন্ত। সম্ভবত, আরও একটু নায়কও।

স্টেজে তো বড় কোনও তারকা থাকলে প্রথমদিকে এঁরা উঠতেই পারেন না।

হ্যাঁ। একদম ঠিকই বলেছ। আমি দেখেছি, স্টেজটা যখন ধীরে ধীরে রাত একটা দেড়টার পর থেকে বাংলা থেকে হিন্দি হয়ে যেতে থাকে, তখনই ডাক পড়ে এঁদের। তবে, যখনই উঠুন, ওঁরা কিন্তু স্টেজটা মাতিয়ে দেন। একজন মূল গায়ক না হলেও, ভালো কণ্ঠী হতে গেলেও তোমাকে ভালো করে গানটা জানতে হবে। শিখতে হবে। রেওয়াজে বসতে হবে। কিন্তু এতকিছুর পরেও, এঁদের যন্ত্রণা কোথায় জানো, এঁরা স্টেজটা পান সবসময়ই নামীদামী শিল্পীদের পরে।

এই যন্ত্রণার ব্যাপারটা আপনার দেখা কোনও ঘটনার উদাহরণ দিয়ে বলতে পারবেন?

আমি গৌতমদার কাছ থেকে একটা ঘটনার কথা শুনলাম। সেটা বহু বছর আগের ঘটনা। গৌতমদার তখন অল্পবয়স। কিন্তু, তখনই উনি যথেষ্ট পরিচিত। দিনে তিনটে-চারটে করে ফাংশন করছেন। তা, উনি দমদমে একটা শো করতে গিয়েছেন। সেখানে সব বিখ্যাত শিল্পীরা গান গাইবেন। উনি বসেই আছেন। ওই শিল্পীরা গেয়েই যাচ্ছেন। রাত এগারোটা বাজল, বারোটা বাজল, আড়াইটে, তিনটে হয়ে ভোর হয়ে গেল। গৌতমদা তখনও বসে আছেন মঞ্চে উঠে গানটা গাইবেন বলে। সকাল ছ’টার সময় ওঁর কাছে এসে উদ্যোক্তারা বলেছিল, দাদা। আজ ছ’টা বেজে গেছে। সকাল হয়ে গেছে। আজ আর হবে না। তবে, আপনাকে কথা দিচ্ছি, পরের বছর আপনাকে ডাকবই। দারুণ বড় করে জায়গা দেব।

প্যাথেটিক

এটার থেকেও বেশি প্যাথেটিক হল পরের বছরের ঘটনাটা। সেই বছরও ওঁকে ডাকল ওই উদ্যোক্তারা। উনি গেলেন। সেই বছরের ফাংশনেও প্রচুর বিখ্যাত গায়ক-গায়িকারা গাইছেন। গৌতমদা ঠায় অপেক্ষা করছেন গান গাইবেন বলে। আবার সেই রাত হল, রাত পেরিয়ে মধ্যরাত হল, মধ্যরাত পেরিয়ে ভোর হয়ে গেল। আবার সেই সকাল ছ’টার আশেপাশের একটা সময় উদ্যোক্তারা এসে বলছে, দাদা। খুব ভুল হয়ে গেছে। এখন সকাল হয়ে গেছে। আপনি দুটো গান কোনওভাবে গেয়ে দিয়ে নেমে যাবেন প্লিজ! গৌতমদা স্টেজে উঠল শান্তভাবে। তারপর কী হয়েছিল জানো?

কী?

গৌতমদা টানা আড়াই ঘন্টা ধরে গান গেয়ে গিয়েছিলেন। এবং, একজন দর্শকও কিন্তু উঠে যায়নি। সকালের ওই আড়াই ঘন্টা তারা মন দিয়ে গানগুলো শুনেছিল। যেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ।

একজন বিশাল তারকা হওয়া সত্ত্বেও এই প্রবলভাবে নেগলেক্টেড কণ্ঠীর চরিত্রে অভিনয় করতে কোনও অসুবিধা হয়নি তাহলে?

না। তার কারণ হল, আমি একজন অভিনেতা। যে চরিত্রে আমি অভিনয় করব, অভিনয়ের সময় সেই চরিত্রটির মতোই হয়ে উঠতে পারাটা অভিনেতা হিসেবেই খুব বড় চ্যালেঞ্জ্। সেই চ্যালেঞ্জটা তো আমাকে নিতেই হবে। আর, দ্বিতীয়ত, ওঁদের আমি দীর্ঘদিন ধরে কাছ থেকে দেখেছি। সেই অভিজ্ঞতাটাও খুব কাজে এসেছে এই চরিত্রটা করতে গিয়ে।

আপনি কণ্ঠীদের স্টেজ পারফরমেন্সের প্রচুর ভিডিও দেখতেন?

প্রচুর। ভারতে বোধহয় হেন কোনও কিশোরকুমার কণ্ঠী বাকি ছিলেন না, ছবিটার আগের চরিত্রটির জন্য প্রস্তুত হয়ে ওঠার সময়টায় আমি যাঁদের একটা ভিডিও দেখিনি! আরেকটা ব্যাপার কী জানো? এঁদের প্রত্যেকের পারফরমেন্সের ভিতর ভীষণ একটা নাটক আছে। একটা অভিনয় আছে। স্টেজ পারফরমেন্সটাকে অন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য এটা খুব জরুরি। ধরো, আমি তোমাকে শানুদার কথা বলছি। শানুদা নিজেই তো স্টেজের ওপর দাঁড়িয়ে শাহরুখ খানের মতো অ্যাক্টিং করত! কিশোরকুমারের স্টেজ পারফরমেন্স আমি দেখেছি। গানের সঙ্গে সঙ্গে ওই প্রবল নাটকীয়তা এবং অভিনয়টাও রয়ে গিয়েছে ভীষণভাবে। কিশোরকুমার তখনকার দিনে স্টেজে উঠতেন সাইকেল চালিয়ে! তো এই পারফরমেন্সটা খুব দরকার। দেখো, এঁরা হচ্ছেন একেকজন ‘দূত’। যাঁরা মূল গানটাকে নিয়ে মানুষের কাছে বারবার করে, বছরের পর বছর ধরে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পৌঁছে দিচ্ছেন। কিশোরকুমারের গান বলো, মহম্মদ রফির গান বলো, কত কণ্ঠী আছে বলো তো এঁদের! মাঝেমাঝে ভাবি, ঠিক কী মাপের গায়ক ছিলেন এঁরা। ঠিক কোন পর্যায়ে পৌঁছেছিলেন তাঁরা, যার ফলে, মৃত্যুর এত বছর পরেও হাজার হাজার কন্ঠী এঁদের গান গেয়ে এখনও সংসার চালিয়ে যাচ্ছেন! ভাবা যায়!

বডি ল্যাঙ্গোয়েজটা স্টেজে খুব গুরুত্বপূর্ণ। নইলে ওই মৌতাতটাই দর্শকমনে জন্মাবে না। আরেকটা ব্যাপার হল, স্টেজ পারফরমেন্স অনেকটা ক্রিকেটের মতো বা থিয়েটারের অভিনয়ের মতো। কোনও রিটেক নেই এখানে…

একদমই তাই। এখানে কোনও ‘আনডু’ অপশন নেই। হোয়েন ইউ আর রং, ইউ আর রং। তাই জন্যই খেলাটা আরও বেশি কঠিন। আর, এখানে অভিনয় মানে শুধু নিজের অভিনয়টাই নয়, যে তারকা বা মহাতারকার লিপে ওই নির্দিষ্ট গানটি রয়েছে, সম্ভব হলে তাঁর মতো অভিনয় করে, তাঁর ম্যানারিজমগুলোকে পারফরমেন্সের মধ্যে এনে ফেলে পুরো ব্যাপারটাকে আরও জমিয়ে দেওয়া।  

বাংলা সিনেমায় ফিরে আসি। এতদিনের কেরিয়ারে বহু পুজো রিলিজ তো আপনি দেখেছেন। কতটা বদল এসেছে এই পুজো রিলিজ এবং তাকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া উন্মাদনায়?

পুজোর এই সময়টা খুব সুন্দর একটা সময়। মানুষ ঠাকুর দেখতে যান, বাইরে খেতে যান, সিনেমা দেখতে যান। পুজোয় বাংলা ছবি রিলিজ করার একটা প্রথা ছিল দীর্ঘদিন ধরেই। মাঝে ওটা বেশ কয়েক বছর ধরে থমকে ছিল। এখন আবার শুরু হয়েছে। এই আবার শুরু হওয়ার ব্যাপারটা কিন্তু তৈরি হয়েছে ‘অটোগ্রাফ’-এর হাত ধরে। তবে আমার নিজের ক্ষেত্রে বলতে পারি, অনেকে ‘লড়াই’ ইত্যাদি বলে বটে, তবে আমার কারও সঙ্গে কোনও লড়াই নেই। এমন পুজোও গিয়েছে, যেখানে আমার একসঙ্গে তিনটে ছবি রিলিজ করেছে।

একের পর এক সিঙ্গল স্ক্রিন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আপনি সিঙ্গল স্ক্রিনে গোল্ডেন জুবিলি দেখা নায়ক। খারাপ লাগে না?

খুবই খারাপ লাগে। খারাপ লাগবে তো বটেই। তবে, আরেকটা কথাও আমাদের মাথায় রাখা উচিত, তা হল, সময়ের সঙ্গে নিজেকেও বদল করে ফেলা। এখন কিন্তু সিটের তলা দিয়ে জল গড়িয়ে যাচ্ছে, এমন কোনও হলে দর্শক আর সিনেমা দেখতে যাবেন না। সময়টা বদলে গেছে। খুব দ্রুত বদলে যাচ্ছে। তার সঙ্গে তো মানিয়ে নিতে হবে। তুমি আজকে য়েভাবে আমার ইন্টারভিু করছ, তোমার পেশার পূর্বসূরীরা কি এইভাবে ইন্টারভিু করত? আমি তখনও ইন্টারভিউ দিচ্ছি, এখনও দিই। পুরো প্রসেসটাই তো বদলে গিয়েছে।  তবে, আমি এটাও বিশ্বাস করি যে, সিঙ্গল স্ক্রিন পুরোপুরি উঠে যাবে না। মাল্টিপ্লেক্সের মতোই সিঙ্গল স্ক্রিনও থাকবে। এটা নিয়ে আমরা সবাই মিলেই চেষ্টা করছি। দেখা যাক।

প্রিয়া বন্ধ রয়েছে। পুজোর সময় সরকারি হল বলে নন্দনও বন্ধ থাকবে। এই পুজো কি বাংলা ছবির কাছে বেশ চাপের নয়?

চাপের পরিস্থিতি। এটা অস্বীকার করে কোনও লাভ নেই। এর ফলে খানিকটা গুটিয়েই গিয়েছি আমরা। সত্যি কথা বলতে, এগুলো তো আমাদের ‘লক্ষ্মী হাউজ’! নন্দন বা প্রিয়া বাংলা ছবিকে শেষের কয়েক বছর ধরে দুর্দান্ত ব্যবসা দিয়ে আসছে। খুবই ভালো ব্যবসা। কথা চলছে। দেখা যাক। আমরা চেষ্টা করছি।

শেষ প্রশ্ন। প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় অটোগ্রাফ দেওয়াটাকে এখন কতটা মিস করেন?

আমি কিন্তু এখনও অটোগ্রাফ দিই। অনেকেই চায়। তবে, নিঃসন্দেহে সংখ্যাটা অনেক কমেছে। এখন সকলে সেলফি নিতে চায়। ওই যে বললাম, বদল! আমি মানিয়ে নিয়েছি। বদলের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াটাই তো জীবন।

অনেক ধন্যবাদ। ‘কিশোরকুমার জুনিয়র’-এর জন্য NDTV Bangla’র পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা রইল।

খুব ভালোলাগল গো। তোমাদের জন্যও অনেক শুভেচ্ছা রইল আমার তরফ থেকে।  


বাংলা ভাষায় বিশ্বের সকল বিনোদনের আপডেটস তথা বাংলা সিনেমার খবর, বলিউডের খবর, হলিউডের খবর, সিনেমা রিভিউস, টেলিভিশনের খবর আর গসিপ জানতে লাইক করুন আমাদের Facebook পেজ অথবা ফলো করুন Twitter আর সাবস্ক্রাইব করুন YouTube
Advertisement
Advertisement