হোমআঞ্চলিক

"শুধুমাত্র আমোদ আর ব্যবসার জন্য ছবি বানাতে পারি না": কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়

  | October 10, 2018 17:57 IST
Kishore Kumar Junior

বাংলা সিনেমার উল্লেখযোগ্য বাঁকটিতে তিনি দাঁড়িয়ে রয়েছেন অনিবার্য তর্জনী হয়ে। NDTV BANGLA-র মুখোমুখি কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়। শুনলেন বোধিসত্ত্ব ভট্টাচার্য।

গত একদশক ধরে বাংলা সিনেমায় যে বাঁকটি তৈরি হয়েছে একটু একটু করে, তার ঠিক মুখেই তিনি দাঁড়িয়ে রয়েছেন এক পূর্ণ তর্জনী হয়ে। অত্যন্ত নির্ভীকভাবে মনে করেন, যে মানুষদের দিকে তেমনভাবে কেউ তাকায় না, তাদের দিকে আলোটা ঘুরিয়ে দেওয়া পরিচালক হিসেবে তাঁর অনিবার্য দায়িত্ব। মৌলিক বিষয়গুলিকে গর্ভিণী করে তোলেন নিজের বক্তব্যটি দিয়ে। ওই দুই মিলেই তারপর খুলে দেয় নতুন এক জানলা... NDTV BANGLA র মুখোমুখি কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়। তাঁর সঙ্গে কথা বললেন বোধিসত্ত্ব ভট্টাচার্য।

আপনার বাবা ছিলেন বিখ্যাত গিটারিস্ট। একজন শিল্পী হিসেবে তাঁর জীবনে অনেক ওঠাপড়া ছিল, নিশ্চয়ই। সেটাই স্বাভাবিক। শিল্পীর সন্তান হিসেবে আপনার জার্নিটা কেমন ছিল? সেটা কি কোনওভাবে ‘কিশোরকুমার জুনিয়র’ ছবিতে কিশোরকুমার কণ্ঠীর ছেলের ভূমিকায় অভিনয় করা ঋতব্রত’র সঙ্গে মিলে যায়?

খানিকটা মেলে। তবে, পুরোটা নয়। কারণ, এঁরা দুজন আলাদা শিল্পী। তাঁদের জার্নিটার মধ্যে একটা বেসিক মিল থাকলেও সেটা ওভারঅল বেশ কিছুটা আলাদা। দেখো, একটা কথা বলি, আমি জন্মানোর পর বলা হতো যে বাবার ‘ভাগ্য ফিরে যায়’। ওই ‘সৌভাগ্য নিয়ে এসেছে’ ইত্যাদি বলা হয় না? এটা সেরকম। তো শিল্পীর জীবনের যে স্ট্রাগল, সেটা শিল্পীর সন্তান হলেও আমি তেমনভাবে দেখিনি। বাবা তখন পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত একজন মানুষ। তবে, স্ট্রাগল তো এক রকম হয় না। বহু ধরনের হয়। স্ট্রাগলের বিভিন্ন আঙ্গিক থাকে, অভিমুখ থাকে। সেগুলো কিন্তু আমি দেখেছি। যেমন, একটা অনিয়মিত জীবনচর্চার সঙ্গে বেঁচে থাকা। শিল্পীদের কোনও টাইম থাকে না। আমার সঙ্গেও যেমন আমার ছেলের দিনে আধঘন্টা কি একঘন্টা দেখা হয়…


সেটা তো খুব সুখের নয়। বাবার কাছেও নয়, ছেলের কাছেও নয়…


একদমই তাই। সুখের কী করে হবে? আমার ছেলে আমাকে রোজ জিজ্ঞাসা করে বেরোনোর সময়- কখন ফিরবে, বাবা? ও এখন যাদবপুরে পড়ে থার্ড ইয়ারে। আমার যেদিন অফ থাকে, সেদিন আমার ছেলেও কোনও না কোনওভাবে পারলে নিজের কাজগুলোকে সরিয়ে রেখে আমার কাছে এসে বসে। আড্ডা মারে। গল্পগুজব হয়। দারুণ একটা সময় কাটে। আমি বুঝি ও আমাকে মিস করে। আমিও যে সময়টা ওকে দিতে পারি না, বাবা হিসেবে সেই সময়টাও আমি ওকে খুব মিস করি।

আপনি কি ছোটবেলায় এই জিনিসটা পেয়েছিলেন? এইভাবে বাবার সঙ্গে গল্প করা, আড্ডা মারার সময়টা?

না গো। আমি এটা তেমনভাবে পাইনি। সেই কারণেই এই ব্যাপারটা নিয়ে আমার মধ্যে একটা কাঙালপনা আছে। আমার বাবা অতটা ‘বাবা’ ছিলেন না। আমার বাবা ছিলেন প্রখ্যাত শিল্পী সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। হয়তো বাবা একবার জিজ্ঞাসা করলেন, খাইছস? বা, মা’কে জিজ্ঞাসা করলেন, ওরা খাইসে? এটুকুই। সরাসরিও জিজ্ঞাসা করত না হয়তো। আসলে কী জানো, সময় ছিল না। তাঁর সাংঘাতিক ব্যস্ততা, কাজ, ভক্ত, স্তাবক… যখন বাড়ি ফিরতেন, তখন আমরা সবাই শুয়ে পড়তাম। তাঁর বন্ধুবান্ধবও আসতেন অনেকেই আমাদের বাড়িতে। প্রত্যেকেই শিল্পী। কিন্তু, তাঁদের জীবনও প্রায় একইরকম। কেউ কেউ সংযমী এবং নিয়মনিষ্ঠ। কেউ কেউ আবার বাঁচছে ভয়ানক অনিয়মের মধ্যে। এই সবটাই দেখেছি।

এই ছবির ট্রেলারে যেমন দেখা যাচ্ছে, বাবার ওপর ক্ষোভে ফেটে পড়ছে ছেলে। তেমন কখনও হয়েছে? বাবাকে দিনের পর দিন ধরে কাছে না পেতে পেতে এই ক্ষোভ জন্মে যাওয়াটা তো স্বাভাবিক।

বাচ্চারা প্রতিবাদ করতে পারে না। বাচ্চারা তো প্রতিবাদ করতে পারে না। তাদের দম আটকে আসে। অনিয়মিত হয়ে যায় শ্বাস-প্রশ্বাস। গলার কাছে মনে হয় কাঁটার মতো কিছু বিঁধে আছে। এগুলো আমি নিজের জীবন দিয়ে দেখেছি। তারপর আমি ন’বছরের জন্য পড়তে চলে যাই নরেন্দ্রপুরে। আসলে, আমাকে নরেন্দ্রপুরে একরকম পাঠিয়েই দেওয়া হয়েছিল। আমার দাদা বাড়িতে থাকত। আমি থাকতাম আমার দাদু-দিদার কাছে। ওটা পড়াশোনা এবং কালচারাল কাজগুলো করার জন্য একটা আদর্শ জায়গা ছিল। ওখানে আমি ঠাকুর বানাতে পারতাম। কাঁথা সেলাই করা। খড় আনা হতো, বাঁশ আনা হতো, কীভাবে ঠাকুর দাঁড় করায়…খেলনা হিসেবে বানাতাম ঠাকুর। মাছ ধরতাম। গুলতি নিয়ে বাঁশবাগানে ঘুরে বেড়াতাম। এইগুলো নিয়েই আমার সময়টা দিব্যি কেটে যেত। রূপকথায় যেমন একটা ছেলেবেলা পাওয়া যায়, অনেকটা সেরকম ছিল আমার ওই সময়টা।

অনেকটা বিভূতিভূষণের গল্পের মতো মনে হচ্ছে শুনে…

হ্যাঁ। বুঝতে পেরেছ? অমনটাই ছিল ঠিক আমার ছোটোবেলাটা। ন’বছর বাদে নরেন্দ্রপুর থেকে ফিরে এলাম…

তখন তো পরিস্থিতিটা বদলে গিয়েছে তাহলে একদম। নরেন্দ্রপুরের একটা ঘোর সংযমী জীবন, আর আপনি আপনার বাবার বাড়িতে পেয়েছিলেন ঠিক তার উল্টোটা…

আমি তো বাবার কাছে থাকতে পারিনি বেশিদিন। যখন নরেন্দ্রপুর থেকে বাড়ি ফিরে আসি, তখন বাবার জীবনটা বদলে গিয়েছিল। বাবার ক্যানসার হয়েছিল। তারপর থেরাপির মাধ্যমে সুস্থ হয়েছিলেন। বাবা দেখতে অনেক অন্যরকম হয়ে গিয়েছিলেন তখন। যদিও, ওই সময়ও বাবার রেকর্ড বেরোচ্ছে। কাজ করছেন। এই ওঠানামাগুলোর মাঝখান দিয়েই আমার একটু একটু করে বেড়ে ওঠা। ওই ‘কয়েকঘন্টার অভিজ্ঞতায় কাঙালি একেবারে বুড়া হইয়া গেল’র মতোই, এই ওঠানামাগুলো দেখতে দেখতেই না আমি আসলে বড় হয়েছি মনে মনে। যে কারণে, আমার কখনও কোনও ঠুনকো গল্প বলতে ভালোলাগে না। মনে হয়, নিজের ছবির মধ্য দিয়ে একটা গভীর কথা বলি। ওটাকে আমি জরুরি বলে মনে করি। কারণ, এত অর্থনৈতিকভাবে দরিদ্র একটা দেশে থাকি আমরা। দিনের পর দিন বিভিন্ন সমস্যায় নতুন করে জর্জরিত হয়ে উঠতে হচ্ছে। তেমন একটা দেশের চলচ্চিত্র শুধুমাত্র আমোদ আর ব্যবসার জন্য হতে পারে না। শুধুমাত্র আমোদ আর ব্যবসার জন্য ছবি বানাতে পারি না। তার যদি কোনও সামাজিক মূল্য না থাকে, কোনও নতুন কথা বলার না থাকে, কোনও বার্তা দেওয়ার না থাকে, তাহলে সেই গল্প লেখা কয়েকটা সাদা কাগজ নষ্ট করা ছাড়া আর কিছুই নয়। সিনেমার ব্যাপারটাও তাই।

 

‘কিশোরকুমার জুনিয়র’-এর গানগুলি ইতিমধ্যে সাড়া ফেলেছে দর্শকমনে। এই যে আপনি বললেন, ‘আমোদের জন্য নয়’, এই গানগুলি দেখে, স্টেজ পারফরম্যান্স দেখে প্রাথমিকভাবে একটা দারুণ আমুদে ব্যাপার টের পাওয়া যাচ্ছে…

এই আমোদের ভিতরটা যে কতটা ক্ষতবিক্ষত, তা বোঝা যাবে ছবিটা দেখলে। এক্ষেত্রে একটা কথা বলে দিই, ‘কিশোরকুমার জুনিয়র’ কিন্তু কোনও ‘বিনাকা চিত্রমালা’ নয়। যে আঠারোখানা গান শুনব বসে বসে। এর মধ্যে দিয়ে একটা ছোট জার্নি আছে। জাতকের গল্পে যেমন জীবনের মূল্যবোধ শেখানো হয়, ঠিক তেমনই কিশোরকুমার জুনিয়র খুব দরকারি একটি সামাজিক কথা বলে।

শিল্পের মাধ্যমে মেসেজ দেওয়ার ব্যাপারটা কতটা গুরত্বপূর্ণ বলে মনে হয় আপনার? ‘একটা মেসেজ দিতে হবে’- এই মনোভাব নিয়ে কি সবসময় শিল্পটিকে একইরকম উত্তরণ দেওয়া যায়?

এই ব্যাপারটা আমার মধ্যে বাধ্যতামূলকভাবে থাকে। আটানব্বই শতাংশ ক্ষেত্রেই থাকে। তবে, সেটা কিন্তু ভীষণরকম ডিজাইন করে নয়। আমি বলি, গল্পটাকে এলিভেট করা। গল্পটা যদি কোথাও একটা গিয়ে এলিভেট করে যায়, তখন নিশ্চিতভাবেই কিছু একটা ঠিকই বেরিয়ে আসে তার ভিতর থেকে। সেটা যে একটা ফেস্টুনের মতো করে থাকবে, তা নয়। এই জিনিসটা না হলে আমার কাছে গল্পটার কোনও মূল্যই থাকে না। যে মেঘে সিলভার-লাইনিং নেই, সেই মেঘ আমাকে কখনও আকৃষ্ট করে না। সেই মেঘে শোভা পাই না আমি। বুঝেছ তো। সে আমার কাছে আর দশটা মেঘের মতোই হয়ে যায় তখন। আমি আর অনেকক্ষণ ধরে ঠায় তাকিয়ে থাকতে পারব না সেই মেঘটার দিকে। যে মেঘটার ধারগুলো একটু জ্বলজ্বল করছে, সেই মেঘটা দিয়েই একটা রবীন্দ্রনাথ হল, একটা ভালুক হল, একটা বাজপাখি হল, তারপর মেঘটা মিলিয়ে গেল কোথাও একটা… এই জিনিসটাই আমার ভালোলাগা। এই সিলভার লাইনিং’টা হচ্ছে- কেন করছি ছবিটা? এই ‘কেন’র উত্তর না পেলে ছবিটা করার কোনও মানে হয় না। সেই উত্তরটা পাওয়ার পর দেখতে হবে, গল্পটাকে কোথাও গিয়ে এলিভেট করাতে পারছি কি না। এবং, এলিভেট করার পর ওই গল্পের বিষয়টা বাড়তি কিছু বলছে কি না। ঘরের মধ্যে যে ঘটনাটা ঘটছে, তার বর্ণনা করতে গিয়ে আমি কোনও জানলা খুঁজে পাচ্ছি কি না। সেই জানলাটা খোলাই হবে, এমন কোনও মানে নেই। হয়তো বন্ধ জানলা, আমি সেটা খুলব। সেই জানলাটা যদি খুঁজে না পাই, তাহলে ওই হাতড়ে বেরাতে আমি রাজি নই একদম।

পৃথিবীর সব ধরনের ‘নকল’-এর মতোই কণ্ঠীদের জীবনেও সবথেকে বড় আয়রনি হল এটাই যে, তিনি ‘আসল’ হতেই চেয়েছিলেন। বা, ‘আসলের মতো’ হতে চেয়েছিলেন। মহাজনরা যে পথেই যান না কেন, তুমি যদি তোমার পথটিতে হেঁটে না যাও, তাহলে তো আর তুমি সম্পূর্ণ ‘তুমি’ রইলে না। তোমার জন্যই তারপর বাজারের অন্ধকার জুড়ে নেমে আসে R-চিহ্ন দেখে কিছু কেনার সতর্কবাণী, তোমার জন্যই তারপর অতি পরিপূর্ণ পোস্টারটিতে ব্র্যাকেট দিয়ে লিখতে হয়- ‘অমুক কণ্ঠী’… ‘আসল’-দের থাকে কণ্ঠ আর নকলরা হয় ‘কণ্ঠী’…এই পুরো ব্যাপারটা কতটা ইন্টারেস্টিং মনে হয়েছিল আপনার?

ভীষণ ইন্টারেস্টিং। তুমি বললেও খুব ইন্টারেস্টিং ভাবে। দেখো, কিছু লোক অতৃপ্ত। কিছু লোক খুব তৃপ্ত। কেউ কেউ ওইটুকুই করতে চায়। কেউ কেউ ওইটুকুই করতে পারে। দুটো মিলেমিশেই থাকে। গৌতম ঘোষ খুব খুশি যে উনি কিশোরকণ্ঠী হয়েই আছেন। এটাই ওঁর কাছে সম্মানের ব্যাপার। এবং, সাধনার ব্যাপার। যে পুরোহিত, সে দেবতার অর্চনা করে। সে কখনও দেবতা হতে চায় না। আবার কিছু মানুষ অবতার হয়ে জন্মায়, এবং দেবতার অর্চনা করতে করতে নিজেরাই কখন দেবতা হয়ে যায়। যেমন রফির গান গাইতে গিয়ে সোনু নিগম। লতার গান গাইতে গিয়ে গিয়ে কবিতা কৃষ্ণমূর্তি। কিশোরকুমারের গান গাইতে গিয়ে কুমার শানু… অনুকরণটাকে কখন তুমি অনুসরণে পরিণত করবে এবং তারপর সেটা নিয়ে এগিয়ে যাবে, এই ক্যালকুলেশনটা ভীষণ প্রাসঙ্গিক এক্ষেত্রে। এই রাস্তা পেয়ে গেল তারা নিজেদের। এগুলো মার্ভেলাস।

আরেকটা ব্যাপার হল, যারা আসল শিল্পীকে অ্যাফোর্ড করতে পারে না, পারছে না, কণ্ঠীরা পৌঁছে যায় তাদের কাছেই…

সেখানে এই কণ্ঠীরা ডাক-হরকরার মতো কিশোরকুমারের গানটা নিয়ে পৌঁছে যায়। কিশোরকুমারের কণ্ঠটা নিয়ে পৌঁছৈ যায়।

মিমিক্রিকে বলা হয়, ‘ইনফিরিয়র ফর্ম অব আর্ট’। কণ্ঠীরা কি কোথাও গিয়ে মিমিক আর্টিস্টদের সঙ্গে মিলে যায়?

না! একেবারেই নয়। মিমিক আর্টিস্টের সঙ্গে তুলনা করাই উচিত না। ওটা একটা ইন্ডিপেন্ডেন্ট আর্ট। তার জন্য রেওয়াজ করতে হয় না। আর এটা কিন্তু সম্পূর্ণ একটা সঙ্গীতচর্চা। এর জন্য গানবাজনাটা রীতিমতো বুঝতে হয়। একটা পূর্ণাঙ্গ সঙ্গীতের তালিম থাকতে হয়। ব্যাপারটা মোটেই সহজ নয়। এবং, এটা দলগত একটা কাজ। অনেকগুলো মানুষ মিলে করেন।  কিশোরকুমার যে সিরিয়াসনেস নিয়ে সঙ্গীতচর্চাটা করেন, গৌতম ঘোষও সেই সিরিয়াসনেস নিয়েই সঙ্গীতচর্চাটা করেন। কিন্তু এই সিরিয়াসনেসটা জীবনের পরিণতি নয়। কিন্তু যখন তুমি ইন্ডিপেন্ডেন্ট গায়কের সম্মান না দিয়ে ‘কণ্ঠী’ বলে ডাকছ, কিশোরকুমার কন্ঠী, তখন ওই কণ্ঠটাই ‘নীলকণ্ঠ’ হয়ে যায়। বিষটা গলায় আটকে রাখতে হয় তখন। এই ব্যাপারটাই আমাকে খুব ভাবিয়েছে জানো তো? মনে হয়েছে, এই গল্পটা কখনও বলা হবে না? যাদের কথা কখনও বলা হয় না, কখনও বলা হবেও না, তাদের কথা বলতে আমার ভালোলাগে। ছায়ায় থাকা মানুষগুলোর জীবনে আলো ফেরার প্রক্রিয়াটিই আমাকে একজন শিল্পী হিসেবে বাঁচিয়ে রাখে।

এটা তো আপনি আপনার প্রতিটি ছবিতেই খুব সুচারুভাবে মেন্টেন করেন

হ্যাঁ। দেখো, আমি না সিনেমা বানানোটাকে কখনওই ব্যবসা বলে দেখি না। ব্যবসা হলে আনন্দ লাগে, সেটা অস্বীকার করছি না। সেই কারণেই এই পাবলিসিটি করার ইত্যাদি। কিন্তু, সত্যি বলতে সিনেমার থেকে খারাপ ব্যবসা তো আর হয় না। এত অনিশ্চিত একটা ব্যবসা! টাকা আসবে কি আসবে না, আমরা জানি না। তার থেকে আমি মাছের ভেড়ি করতাম, কয়লার ব্যবসা করতাম, খাওয়ার একটা হোটেল খুলে ফেলতাম যেখানে নিশ্চিতভাবে প্রচুর প্রফিট হতো। সিনেমা কেন করব তাহলে? রামকৃষ্ণ গিরীশ ঘোষকে বলেছিলেন, থ্যাটারে লোকশিক্ষে হয়। এই ‘লোকশিক্ষে’ শব্দটাকে আমি খুব গুরুত্ব দিই। এখন আমার পঞ্চাশ বছর বয়স হয়ে গিয়েছে, যতদিন ছবি বানাব, এই ‘লোকশিক্ষে’-টাই হবে আমার কাছে প্রথম ক্রাইটেরিয়া।

কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের ছবিতে এই প্রথম অ্যাকশন রয়েছে। বিস্ফোরণ হচ্ছে। সন্ত্রাসবাদী, রাজস্থান সমস্ত কিছু…

তুমি ‘শঙ্করা ভরানাম’ ছবিটা দেখেছ?

দক্ষিণ ভারতীয় ছবি। হ্যাঁ। দেখেছি। তেলুগু ছবি।

হ্যাঁ। সেই ছবিতে একজন চরিত্র ছিলেন, যিনি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের চর্চা করেন। উচ্চাঙ্গসঙ্গীতের গুরু ছিলেন তিনি। তা, তাঁকে একজন রক গায়ক এসে একবার তাঁকে অপমান করেছিলেন। তখন তিনি রক গানটা গেয়ে দেন। গেয়ে দেওয়ার পর বলেছিলেন, আমি তো তোমারটা গেয়ে দিলাম। তুমি এবার আমার গানটা গেয়ে দেখাও দেখি! আমি এটা বিশ্বাস করি। যদি ধ্রুপদী চর্চা থাকে সিনেমা সম্পর্কে। তাহলে নানারকম ছবি বানানো যায়, যদি মানুষ চায়। আর এটা আমাদের এখন দায়িত্ব হয়ে গিয়েছে যে আমাদের ছবির ক্যানভাসটাকে আরও বড় করা। আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে যাওয়া। কারণ, মেনস্ট্রিম ছবির সংজ্ঞাটাই বদলে যাচ্ছে। বাংলা ছবির ইন্ডাস্ট্রির জন্য নিজেদের দর্শন এবং ভাবনাগুলোকে সঙ্গে নিয়েই ছবি বানাতে হবে এখন আমাদের। ইন্ডাস্ট্রিটাকে বাঁচিয়ে রাখা আমাদের সকলেরই বড় দায়িত্ব।   


বাংলা ভাষায় বিশ্বের সকল বিনোদনের আপডেটস তথা বাংলা সিনেমার খবর, বলিউডের খবর, হলিউডের খবর, সিনেমা রিভিউস, টেলিভিশনের খবর আর গসিপ জানতে লাইক করুন আমাদের Facebook পেজ অথবা ফলো করুন Twitter আর সাবস্ক্রাইব করুন YouTube
Advertisement
Advertisement