হোমআঞ্চলিক

ভারতীয় চলচ্চিত্রে, এই ছবি যেন পাহাড়চূড়ায় ঈশ্বরের ডাকবাংলো

  | June 14, 2018 19:10 IST (কলকাতা)
Watchmaker

অনিন্দ্য পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নতুন ছবি 'ওয়াচমেকার' দৃশ্য

অনিন্দ্য পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নতুন ছবি 'ওয়াচমেকার' দেখে লিখলেন বোধিসত্ত্ব ভট্টাচার্য।

একটি শব্দহীন অবসাদগ্রস্ত দেওয়াল। তার কান ছিল হয়তো কখনও। এখন নেই। সে আর শুনতে পায় না। দেওয়ালটির উপর পড়ে আছে অল্প আলো। বাকিটা, সেই আলোর গায়েই ঘাড় মটকে পড়ে থাকা আলোর শব। একটি জন্মের ভিতর, অথবা, জন্মের পাশেই একটি বীভৎস মৃত্যু। অর্থাৎ, ছায়া। যেমনভাবে পড়ে থাকে। ছায়াটি থেকেই পরপর, প্রায় অলৌকিক তড়িৎগতিতে ঘটে যায় তিনটি জন্মের নিবিড় নির্মাণ। যেন, মধ্যরাতের অনন্ত স্বপ্নের কেন্দ্রেই তরঙ্গিত হতে থাকে তারা। মানুষ, টুপি ও চেয়ার। তিনটি পৃথক বস্তু? নাকি, স্রেফ তিনটি দৃশ্য, যাদের কোনও অভিভাবক নেই!... সেই স্থাণু পরিবেশ দেখলে মনে হয়, তাদের সমস্ত শব্দভাণ্ডার হাতিয়ে নিয়ে গিয়েছে যেন কেউ। ওই ছায়ার ভিতরেই চিন্তা ও যাবতীয় ভাবের আদানপ্রদান সারছে তারা তিনজন- টুপি, মানুষ ও চেয়ার- কুবেরি কার্পণ্যে। শব্দহীনতাই এখানে একমাত্র শব্দ। শব্দহীনতাই এখানে ভাষা। ইতিহাস ও সভ্যতার ওপর অমোঘ কুঠারের মত এর ঠিক পরেই এসে পড়ে কয়েকটি দৃশ্য। বেশ কয়েকটি দৃশ্য। তারাও শব্দহীন। হিরোশিমা,  বিশ্বযুদ্ধ, রক্ত, মৃত্যু, সোমালিয়ার হাড়-পাঁজর বের করা অনাহার... দৃশ্য থেকে জন্ম হয় দৃশ্যের। যেমনভাবে, বাতাস থেকে বাতাস অথবা চিরকালীন কোনও হেরে যাওয়া মানুষের হলুদ বমি  হয়ে যাওয়ার পর জন্ম হয় বিকেলের...
অথবা জন্ম হয়, যেন পুনর্জন্মও, শব্দের। আসলে, বাক্যটির- উই অল আর ওয়েটিং ফর দ্য কিংস লেটার...এই বাক্যে আপাতদৃষ্টিতে জটিল,  সূক্ষ্ম, সরল, বিশ্বাস বা দ্বন্দ্ব কোনওকিছুরই অনিশ্চয়তা নেই। যা আছে,তা হল, সময়ের একরৈখিক ভাবনাটির দিকে এক উজ্জ্বল ও নির্মেঘ কটাক্ষ। 
যা আছে, তা হল গনগনে মেধাবী দৃশ্যসমাবেশের ক্লাসিকাল  স্পষ্টভাষণ, যাদের, এই শিকড়শূন্য সময়ে দাঁড়িয়েও,
কী আশ্চর্য, মনে হচ্ছে বিপ্লবের রহস্যময় দরজা!
যা আছে, তা হল- সিনেমা...
 
ছবিটির নাম- ওয়াচমেকার।
watchmaker

 ছবিটিতে মূল চরিত্র চারটি। প্রথম তিনজনের কথা আগে বলে নেওয়া যাক। প্রথমজন ঘড়ি তৈরি করেন। এক হাজার বছর ধরে ঘড়ি তৈরি করে যাচ্ছেন তিনি। কিন্তু, তাঁর তৈরি করা ঘড়ির সময় কখনওই 'ক্লকওয়াইজ' এগোয় না।অ্যান্টিক্লকওয়াইজ এগোয়। অর্থাৎ, ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকই তাঁর কাছে ঘড়ির কাঁটার দিক। সকাল আটটায় ঘড়িটি তৈরি হলে আধঘণ্টা বাদে সেখানে বাজবে সাড়ে সাতটা। ছেড়ে আসা সময়টিতেই আবার ফিরে যাওয়া। একটি বৃত্ত পূর্ণ হয়ে চলেছে এভাবেই। মানুষ তো আসলে তার ছেড়ে আসা সময়টিরই দাস...
watchmaker

 
দ্বিতীয়জনের কাছে সময় থমকে গিয়েছে। দিল্লি থেকে রাত আড়াইটের সময় ফ্লাইটে উঠে কলকাতা পৌঁছে তিনি জানতে পারেন, ঘড়িতে তখনও রাত আড়াইটেই বাজে। তাঁর সময় এগোয় না, পিছোয়ও না। পেন দিয়ে কবজিতে আঁকা ঘড়ির মতোই তাঁর ঘড়ির সময়টিও এখানে বোবা। মূকচিহ্ন।
 
তৃতীয় চরিত্রটির কাছে সময়ের কোনও অস্তিত্ব নেই। তাঁর সময় স্পর্শ করেছে শূন্যকে। যদিও এই সময়-শূন্য  চরিত্রটি ছবির সময়ের ভিতর  ঢুকে গিয়ে ছবিতে ঘটতে থাকা প্রতিটি ঘটনার পাশেই একটি তর্জনী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন।
 
আর, ছবির চতুর্থ চরিত্রটি হলেন সময় স্বয়ং। অংশ থেকে সমগ্রের দিকে যাত্রায় তিনিই তো আসল শিল্পী, যিনি আমাদের অস্তিত্বের মূলে জলদান করেন। ছলনাময়ী, নিষ্ঠুর, চলৎপ্রতিভাময়ী হলেন তিনি। একইসঙ্গে মধুবালাপ্রতিম অনন্তযৌবনাও।
 
আমাদের এই চেনা সময় একদিন পুরনো হয়ে যায়। আমাদের পরিচিত সময় একদিন ফুরনো হয়ে যায়। অতীত হয়ে যায় সমসাময়িকতা। সময়ের ভিতরে সময়, তার ভিতরে মানুষ, তারও ভিতরে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে উঠতে উঠতে- আসলে সে উঠেই চলেছে, কোথাও পৌঁছচ্ছে না- একটি বাচ্চা মেয়ে এই পুরো গল্পটি শুনে যাচ্ছে। শুনতে শুনতে সে নিজেও আক্ষরিক অর্থেই প্রবেশ করছে কাহিনীর আত্মায়। যে আত্মার আলো আমাদের তিলেতিলে বুঝিয়ে দেবে, ঠিক কোন প্রজাতির মহাকাব্য রচনার চেষ্টা করা হয়েছিল এই ছবির মাধ্যমে। ভারতীয় চলচ্চিত্রের নিরিখে অনিন্দ্য পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই ছবি যেন পাহাড়চূড়ায় ঈশ্বরের ডাকবাংলো...
ছবি:- ওয়াচমেকার
পরিচালনা:- অনিন্দ্য পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়
অভিনয়:- অনিন্দ্য পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়, ঋতাভরী চক্রবর্তী, ঋতব্রত ভট্টাচার্য
শিল্প নির্দেশনা:- হিরণ মিত্র
সঙ্গীত:- চিরন্তন বন্দ্যোপাধ্যায়
ডিরেক্টর অব ফটোগ্রাফি:- মধুরা পালিত
ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর:- পম্পা বন্দ্যোপাধ্যায়
 


বাংলা ভাষায় বিশ্বের সকল বিনোদনের আপডেটস তথা বাংলা সিনেমার খবর, বলিউডের খবর, হলিউডের খবর, সিনেমা রিভিউস, টেলিভিশনের খবর আর গসিপ জানতে লাইক করুন আমাদের Facebook পেজ অথবা ফলো করুন Twitter আর সাবস্ক্রাইব করুন YouTube
Advertisement
Advertisement