হোমআঞ্চলিক

নাট্যসমালোচনা: 'ক্যাপ্টেন হুররা'- এক অন্যরকম সাহসের রূপকথা

  | September 04, 2018 08:55 IST (কলকাতা)
Bengali Drama

মোহিত চট্টোপাধ্যায়ের নাটক 'ক্যাপ্টেন হুররা'কে নতুনভাবে দেখলেন সৌরভ পালোধি। সেই নাটকটি নিয়েই লিখলেন বোধিসত্ত্ব ভট্টাচার্য।

নাটক:- ক্যাপ্টেন হুররা

প্রযোজনা:- ইচ্ছেমতো

নাট্যকার:- মোহিত চট্টোপাধ্যায়

পরিচালক:- সৌরভ পালোধি


অভিনয়ে:- তূর্ণা দাশ, অপ্রতিম সরকার, সুলগ্না নাথ, শুভায়ন ঘোষ, অরিন্দম সরদার, কুশল চট্টোপাধ্যায়, শুভেন্দু চক্রবর্তী, শুভাশিষ খামারু, কৃষ্ণেন্দু সাহা এবং শুভ্রজ্যোতি বাগচী

আলো:- সৌমেন চক্রবর্তী

সুর:- দেবদীপ মুখোপাধ্যায়

মঞ্চসজ্জা:- টিম ‘ইচ্ছেমতো’

মাঝেমাঝে খুব অস্থির লাগে। মনে হয়, পা থেকে মাথা পর্যন্ত প্রবল তাগত নিয়ে একটি বিদ্যুৎ উঠছে ও নামছে। মনে হয়, একটা বজ্রমুষ্টি, যা সত্যের জন্য জান দিয়ে দিচ্ছে একেবারে নগ্নভাবে। অথবা, মনে হয়, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আগুন গিলে বসে থাকা একটি হিরের কথা। তারপর আর কিছু মনে হয় না। মনে পড়ে না। আমরা কেবল ঘুমের অপদার্থ থলেটির ভিতর হাত-পা মুড়ে ঢুকে যাই। শ্রম ও স্রোতের যে ইতিহাসটি সেই থলের পাশ দিয়েই কেউটের ফণা হয়ে লকলক করে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে পড়ে, তার কথা আর আমরা জানতে পারি না। কেবল, শেষ বাসে করে বাড়ি ফেরার সময় জানলার ধারে বসে ধর্মতলার মোড়ে হাতে চটের ব্যাগ নিয়ে লাইটপোস্টের আলোয় একা দাঁড়িয়ে থাকা দুর্বোধ্য মুখের লোকটার দিকে তাকিয়ে ভাবি, কীসের জন্য এত অনন্ত অপেক্ষা ওর? কোনও ম্যাজিকের জন্য কি? নাকি কোনও নতুন দেশে যাবে বলে, সেই দেশটার বাস ধরবে বলেই ওখানে ওইভাবে দাঁড়িয়ে আছে মানুষটা? এমনই এক দেশ, যা এখনও আবিষ্কারই হয়নি… পুরোটা আসলে ভাবতেও পারি না। কারণ, কন্ডাকটর বলে, দাদা টিকিট। আর, আমাদের তখন মনে পড়ে, রাতের গরম ভাতের পাশে বসে কেউ একজন আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে…

eba91v48

যে জায়গায় এসে আমাদের ভাবনার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে একটি লাল সিগন্যাল, ঠিক সেই জায়গা থেকেই নিজের ভাবনাটিকে যেন একটি লাল রঙের বাইকে বসে গোল অন্ধকারে ঠাসা পৃথিবীর উদ্দেশে চালিয়ে নিয়ে গিয়েছেন সৌরভ পালোধি। চালিয়ে নিয়ে গিয়েছেন ইচ্ছেমতো। চালিয়ে নিয়ে গিয়েছেন ‘ইচ্ছেমতো’… খাঁচার পাখি হয়ে বেঁচে থাকার কোনও গল্প নেই যেখানে। সেখানে রয়েছে কেবল নিয়মভাঙার কবিতা। অস্বস্তিকর হয়ে ওঠার উপন্যাস (পুজোসংখ্যার নয়)।

scefg488

আসলে তো নিয়মভাঙাই! এটাই যেন সংজ্ঞা! এবং, সেটাই উদাহরণও! গোটা মঞ্চ জুড়ে কোনও এক অদৃশ্য ও অ-ভাবনীয় শেকল বেয়ে নেমে আসছে নাশকতার নাজুক তোপধ্বনি। নাটকটির নাম- ক্যাপ্টেন হুররা। চার দশকেরও বেশি সময় আগে নাটকটি লিখেছিলেন মোহিত চট্টোপাধ্যায়। ইতিহাস সাক্ষী, অজস্র শেকলভাঙায় যিনি রেখে গিয়েছেন নিজের বুড়ো আঙুলের ছাপ। সেই সচেতন ইতিহাস-প্রণালী বেয়েই নাটকটি নেমে এলো দু’হাজার আঠারো সালে। নামাল যে দলটি- আসলে ঘটালো আরেকরকম উত্তরণ- তার নামেই মালুম, সে এসেছে বেড়াটা ভাঙতেই… ইচ্ছেমতো…

গোটা মঞ্চ জুড়েই ইচ্ছেমতোই স্থাপন। সেটে বস্তা, টায়ার, পুরনো ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট টিভি ঝুলছে- সেটায় খালি ঝিরঝির, ড্রাম, মই, ট্রাঙ্ক, সুটকেস, এবং-এই ‘এবং’টা বোল্ডে লিখলে ভালো হত- একটি কাঁটা তার। দীর্ঘ প্রবাসে থেকে বহুদিন বাদে দেশে ফেরার পর মানুষ জেটল্যাগে পড়ে। অর্থাৎ, যে সময়টায় এতদিন কাটিয়ে এলেন তিনি, তা ছেড়ে বেরোতে পারেন না। এই নাটকটি দেখতে এসে মানুষ যে ‘সেট’ল্যাগে পড়বেন, এমন একটি কথা বেশ সচেতনভাবেই বলে দেওয়া যায়। একটি সেট যদি একটি সময় হয়, তাহলে এই নাটকের দর্শকেরও সেই সময়টি থেকে বেরিয়ে আসতে সময় লাগবে।

ksn242ug

বেশ কয়েকটি গান রয়েছে এই নাটকে। কিন্তু, সেই সঙ্গীত নেপথ্যের হয়েও ঠিক নেপথ্যের নয়। কেন নয়, তা জানার জন্য দেখতে হবে নাটকটি। সঙ্গীত যে একটি নাটকের আবহের জায়গা থেকে ঠিক কতটা আলগাভাবে বেরিয়ে এসে মঞ্চের চাকা হয়ে উঠতে পারে, তা ‘ক্যাপ্টেন হুররা’র প্রথম শো দেখতে গিয়েই বেশ মালুম হয়।

চাকাই তো! একটি হোটেলের মালিকের নাম ক্যাপ্টেন হুররা। নিজের হোটেলটিকে জাহাজ ভাবেন তিনি। ভাবেন গোটা হোটেলটিই এগিয়ে চলেছে এমন একটি দেশের উদ্দেশে, যেখানে হাত বাড়ালেই বুক ভরা বাতাস ও মাটি খুঁড়লে সোনা। যেন হাওয়াতেই আঁকা হয়ে যাচ্ছে বৌদ্ধিক অবাধ্যতার গাঢ় ক্ল্যাসিক এক ছবি। ক্যাপ্টেন হুররার চরিত্রে রয়েছেন তূর্ণা দাশ। মঞ্চে দাঁড়িয়ে এত নিখুঁত ও নিয়মানুগ ছন্দ মেনেও তিনি যেরকম বিপজ্জনকভাবে অভিনীত চরিত্রটির আত্মায় মেরে দেন মহত্ত্বের নিপুণ সিলমোহর, তা ইতিহাসর পাতা ধরেই হেঁটে যাবে বলে মনে হয়। চরিত্রটির উচ্চকিত পোশাকের ভিতরে লুকিয়ে থাকা গভীরতম রক্তবিন্দুটির হাহাকার টের পাওয়া যায়।

অভিনয়ে অন্যান্যরাও অনবদ্য। তবে, কারও কারও একটি-দুটি জায়গায় সংলাপ বলতে গিয়ে কিছুটা অপ্রতিভতা টের পাওয়া যাচ্ছিল। সেটা প্রথম শো বলে হতে পারে, কিন্তু প্রথম শো বলেই বা তা হবে কেন?

নাটকের দ্বিতীয়ার্ধে এলেন অরিন্দম সরদার। চরিত্রটি একটি চোরের। খুব বেশি সময় যে মঞ্চে ছিলেন, তা নয়। অথবা, তিনি হয়তো ছিলেন অনেকক্ষণই, কিন্তু মনে হচ্ছিল, আরও একটু কেন থাকছেন না। পৃথিবীর সব দীপ নিভে গেলেও কেউ কেউ যেমন পারেন, কেউ কেউ ঠিকই পারেন প্রদীপটি জ্বালিয়ে নিতে, তিনিও যেন ঠিক সেই কাজটিই করে গেলেন। প্রথমার্ধের বিরতির অন্ধকার উঠে যাওয়ার পর দ্বিতীয়ার্ধের আলো তিনিই।

মঞ্চের আলোকসজ্জা অফুরান। যে আলো না থেকেও থেকে যায়, তেমনই একটি আলো তৈরি করেছেন সৌমেন চক্রবর্তী। মেক-আপ যথাযথ।

সবে প্রথম শো হয়েছে ঠিকই। তবু গর্জনটা টের পাওয়া যাচ্ছে। ক্যাপ্টেন হুররা সত্যিই নেমে এসেছে শহরে। হয়তো এখন সে রয়েছে ধর্মতলার আলোতে চটের ব্যাগ হাতে নিয়ে একা দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির পাশেই। কী কথা বলছে সে, তা জানতে ইচ্ছে করে। আর, বলতে ইচ্ছে করে, নাটকটি দেখুন। নইলে ঠকবেন, ঠকবেন, ঠকবেন, ঠকবেন। তিনবার লেখাই যেত। তবু, চারবার লিখলাম। কারণ, কে না জানে, প্রকৃত নাটক কখনওই অতিনাটকীয়তা পছন্দ করে না।


বাংলা ভাষায় বিশ্বের সকল বিনোদনের আপডেটস তথা বাংলা সিনেমার খবর, বলিউডের খবর, হলিউডের খবর, সিনেমা রিভিউস, টেলিভিশনের খবর আর গসিপ জানতে লাইক করুন আমাদের Facebook পেজ অথবা ফলো করুন Twitter আর সাবস্ক্রাইব করুন YouTube
Advertisement
Advertisement