হোমআঞ্চলিক

'দেশকে সবথেকে বেশি দূষিত করে সাম্প্রদায়িক উচ্চারণ': কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়

  | January 07, 2019 18:31 IST (কলকাতা)
Koushik Ganguly

কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়। (ফাইল চিত্র)

ছবি বানানোর একদম শুরুর দিন থেকেই তিনি নতুন গল্প বলতে চেয়েছেন। তাঁর আগের ছবির সঙ্গে পরের ছবির বিষয়বস্তুর মধ্যে মিল থাকে না কোনও। নিজেকে ক্রমাগত ভাঙতে ভাঙতে এগোনোতেই বিশ্বাসী। নতুন ছবি 'বিজয়া' মুক্তি পেয়েছে তিনদিন আগে। সেই ছবি, ছবি বানানোর গল্প এবং ছবির চরিত্রদের জন্মানোর গল্প নিয়ে অকপট পরিচালক কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়। NDTV বাংলা - র পক্ষ থেকে তাঁর উল্টোদিকে রইলেন বোধিসত্ত্ব ভট্টাচার্য।

বোধিসত্ত্বঃ- 'বিসর্জন' লিখেছিলেন যখন, মনে হয়েছিল এত বিপুল সাফল্য পাবে?

কৌশিকঃ- না। সত্যি বলছি তোমাকে, ভাবিনি। আসলে লেখার সময় তো এত কিছু মাথায় থাকে না। তখন কেবল লেখাটা থাকে। তার বিষয়টা থাকে। চরিত্র ও সংলাপগুলো থাকে। গল্পটা নিয়ে যখন সিনেমাটা হচ্ছে, তখনও এইগুলো মাথায় থাকে না। থাকলে আমি কাজটা করব কখন! ছবিটা শেষ করার পর মনে হয়েছিল, যা বলতে চেয়েছিলাম, তা অনেকটাই বলতে পারলাম। হয়তো, দর্শকদের পছন্দ হবে। কিন্তু, সেটা যে এত দারুণ সাফল্য পাবে, দর্শক থেকে সমালোচক- সকলেই গ্রহণ করবে ছবিটাকে এত হৃদয় দিয়ে এবং বক্স-অফিসও দেখবে দারুণ লাভের মুখ, এতটা সত্যিই ভাবিনি।


স্বীকার করতে সমস্যা নেই, অনলাইন ছবি এসে সব বেড়া ভেঙে দিয়েছেঃ আবির চট্টোপাধ্যায়

'বিসর্জন' ছবির শেষটা খানিকটা অসম্পূর্ণ। যথাযথভাবে একটা 'শেষ হয়েও হইল না শেষ'-এর সুর লেগে আছে। একেবারে চিরাচরিত ছোটোগল্পের সুর। ছবিটির এই অসম্পূর্ণতাই যেন কোথাও গিয়ে সম্পূর্ণতা। তাহলে আবার 'বিজয়া' তৈরির কথা ভাবলেন কেন? গল্পটা টেনে বাড়ানোর দরকার ছিল কি?


না। দেখো, টেনে বাড়ানোর ব্যাপার নয় এটা। আর, আরেকটা ব্যাপার হল, গল্পটা বাড়লেও তাতে আর কোনও অসম্পূর্ণতা থাকবে না, তা তো নয়। এখানেও ঠিক তাই। আমি 'বিজয়া'তে গিয়ে 'বিসর্জন' থেকে আসা কিছু প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দেব ঠিকই, 'বিজয়া' দেখে বেরোনোর পর কিন্তু দর্শকদের ঝুলিতে আরও কিছু প্রশ্ন গুঁজে দেব সন্তর্পণে। প্রশ্নটা কিন্তু থাকবেই...

এ তো মাধ্যমিক পরীক্ষা! প্রত্যেক বছর নতুন প্রশ্নপত্র...

(হাসি) আরেকটা কথা বলি তোমাকে, আমার না এটা লিখতে অদ্ভুত আনন্দ লেগেছিল। এই চরিত্রগুলো আমার তৈরি করা চরিত্র তো। তারা যখন আবার বছর দুয়েক বাদে বেঁচে উঠেছে...একই পোশাক, একই মানসিকতা নিয়ে কথা বলছে... ওয়ান্ডারফুল এক্সপেরিয়েন্স। বলে বোঝানো যায় না। 

আপনার কি আপনার লেখা চরিত্রদের সঙ্গে দেখা হয়? কথা হয়?

অবশ্যই হয়। অবশ্যই। এখানে কোনও ফ্যান্টাসি নেই। ওরাই আচমকা কোনও এক মুহুর্ত থেকে আমার লেখা স্ক্রিপ্টের দায়িত্ব নিয়ে নেয়। এই গণেশ মণ্ডল, নাসির আলি... ওদের ছেলেটা বড় হচ্ছে...এরা তো আমারই সৃষ্টি করা, আমার সন্তানের মতোই, সন্তানই... সন্তানকে প্রথমবার হাঁটতে দেখে, প্রথমবার তার মুখে বুলি ফুটতে দেখে যেমন অমোঘ আনন্দ হয়, এটাও সেরকম।

গল্পের যে মুহূর্তে এসে গল্পের দায়িত্ব নিয়ে নেয় চরিত্ররা, সেই মুহূর্তগুলো আপনি টের পান? স্পর্শ করতে পারেন?

আমি জানো তো, তোমাকে বলি, যখন লিখি, তখন তো বুঁদ হয়ে লিখি। এবার, খুব স্বাভাবিকভাবেই ওই সময়টা বাহ্যিক কিছু আমাকে স্পর্শ করবে না। আমি ধরো লিখছি, ৫০ পাতা ৫৫ পাতা হল, আচমকা বুঝতে পারলাম, এমন একটা নতুন কথা বলে দিল আমার কোনও চরিত্র বা এমন একটা নতুন কাজ করে দিল, যা আমি ২ সেকেন্ড আগেও তো ভাবিনি! 

আরও পরুনঃ রিভিউঃ বিসর্জনের ছায়া হয়েই থেকে গেল বিজয়া

অর্থাৎ, একটা অনিবার্য বাঁক বদলে যাওয়া... 

একদমই তাই। ৫৫ পাতা অবধি হয়তো আমি ভেবেছিলাম, আমার গল্পটি এমনটা হবে। এই পথে চলবে। ৫৮ পাতায় এসে বুঝলাম ওরা চায় গল্পটা অমন হোক। ৬৫ পাতায় এসে দেখলাম, আমার গল্পটা নিয়ে দুলকি চালে এগিয়ে গেল গণেশ মণ্ডল বা নাসির আলি। কারণ, ওটা তো তখন ওদের গল্প। ওদের জীবন। ওদের লড়াই...

একজন মগ্ন ও মহৎ গল্পকারেরই সাক্ষাৎকার নিচ্ছি বলে মনে হচ্ছে...

দেখো, তুমি যদি আমাকে মহৎ গল্পকার বলো এর জন্য, তাতে আমার আপত্তি নেই। কিন্তু, আমি দিনের শেষে একটা ভালো গল্প বলতে চাই। এছাড়া, আমার আর কোনও চাহিদা নেই তেমন। 

লেখার সময়টুকু কীভাবে নিজেকে প্রস্তুত করেন?

ঘন্টার পর ঘন্টা আমার ঘরের একটা চেয়ারে বসে থাকি। বসে বসে লিখি। ওই সময়টা খুব নোংরা পরিস্থিতি হয়। বাড়িতে সবাই জানে। রাত এগারোটার সময় হয়তো স্নান করলাম। আরেকটা ব্যাপার বলি তোমাকে, আমি ওই গল্পটা লেখা শুরুর আগের তিন-চারটে দিন স্রেফ ওই চেয়ারটাতেই বসে থাকি। ধরো, কিছু মাথায় এল, তখন কাগজটা নিয়ে একটু হিজিবিজি কাটলাম। কিন্তু বসেই থাকি। অনেকক্ষণ বসে থাকলে তো পিঠ-ঠিট ধরে যায়। তখন একটু উঠি। আসলে কী জানো, এই ব্যাপারটা না দই পাতবার মতো। বেশি বাটি নাড়ালে কিন্তু দইটা পাতা যাবে না। তাই, ওই বসাটা জরুরি। চুপ করে নিজের মধ্যে বসে থাকাটা জরুরি...

বসতে বসতেই কি লেখাটা তৈরি হয়? মানে, জানতে চাইছি যে, কখনও কি এমন পরিস্থিতি আসেনি যখন মনে হচ্ছে, এতটা সময় ধরে ভাবছি, অথচ, লেখাটা কিছুতেই আসছে না...

হয়। অনেক সময়েই হয়। এটা তো খুব নিয়ম মেনেই চলবে ঘড়ির কাঁটার মতো, তেমন ব্যাপার নয়। অনেকসময়ই গল্পটা আসতে দেরি হয়। কিন্তু যখন আসে... একটা ফ্লাডগেটের মতো। হুড়মুড় করে খুলে গেল যেন। 

একপাতা, দু'পাতা লিখতে লিখতে হঠাৎ মনে হয় একটা তেইশ পাতা চলে এল?

হ্যাঁ। একদম ঠিক কথা বলেছ। আমার মনে হয়, এক পাতা বা দু'পাতা থেকে এই যে হঠাৎ চলে আসা তেইশ পাতা, তার মাঝের পাতাগুলো যে ভুলে গেলাম, সেগুলোই হল গল্পের বীজ। যখন থেকে আর পাতার সংখ্যা মনে থাকছে না, তখন থেকেই আমার গল্পটা এগোতে শুরু করছে...

আপনি তখন কোথায় থাকেন? চরিত্রদের পাশে? নাকি, ওরা আগে আগে যায়? মানে, জার্নিটা ঠিক কীরকমভাবে আপনি দেখেন, সেটা জানতে চাইছি...

এখানে একটা খেলা চলে, বুঝলে তো! খুব মজার খেলা। কখনও ওরা আগে আগে পথ দেখাচ্ছে। কখনও আমি। কখনও আমরা পাশাপাশি চলছি। কখনও মিশে যাচ্ছি...এটা একটা অদ্ভুত রেস। আর, অনেকসময় শেষটা বদলে যায়...আর, মাঠে যখন পড়ল, মানে, সেটে এল গল্পটা, তখন তো আরও বদলে যায়... তবে, একটা কথা আমি বিশ্বাস করি, যত তাড়াতাড়ি চরিত্রগুলো স্ক্রিপ্টের দায়িত্ব নিয়ে নিতে পারছে, ততই তা স্ক্রিপ্টের পক্ষে খুব ভালো। 

'বিসর্জন'-এর গল্পটাকে আপনি একজন গল্পকার বা গল্প বলিয়ে হিসেবে কী চোখে দেখেন?

দেখো, 'বিসর্জন'-এর গল্পটা ছিল গল্প হিসেবে সাদামাটা। এটা আমার স্বীকার করতে কোনও দ্বিধা নেই। অনেক বাঁক রয়েছে বা খুব জটিলতার মধ্যে দিয়ে গিয়েছে গল্পটা, এমনটা নয়। সেই তুলনায় কিন্তু 'বিজয়া'র গল্পটা অনেকটা জটিল। তার কারণ, 'বিজয়া' শুরুই হচ্ছে কতগুলো প্রশ্নের বীজ থেকে।

বিষয় হিসেবে দেশভাগকে আপনি কীভাবে দেখেন? 

আমি পছন্দ করি না। ঘৃণা করি সেই রাজনীতিবিদদের যাঁরা এটা করেছিলেন। আমি তো এটা চেয়েছিলাম, একপ্রান্ত থেকে বল করবেন কপিল দেব, আরেকপ্রান্ত থেকে ইমরান খান। পৃথিবীর সর্বকালের সেরা ক্রিকেট টিমটাকেও নষ্ট করে দিয়েছেন এই রাজনীতিবিদরা। দেশকে দুর্বল করেছি আমরা। হিন্দু-মুসলমান করে নষ্ট করেছি আমরা। ধোঁয়া ইত্যাদি অনেক পরের ব্যাপার। দেশকে সবথেকে বেশি দূষিত করে সাম্প্রদায়িক উচ্চারণ। এই জায়গা থেকেই অনেক বেশি করে প্রয়োজন 'বিসর্জন' কিংবা 'বিজয়া'র মতো গল্পের।

আর, যাঁরা ওপার বাংলা থেকে এপার বাংলায় চলে এলেন, সেই দেশভাগ?

সেটা আমার মূলত শোনা। তখন তো আমি জন্মাইনি। তবে, মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি জন্মে গিয়েছিলাম। ওই যুদ্ধের সময় কাচের জানলায় রঙিন কাগজ লাগানোর দিনগুলোর কথাও মনে পড়ে। ওপার বাংলায় মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যত কাজ হয়েছে, দেশভাগ নিয়ে ততটা নয়। অবশ্য, আসল শিল্প তো যন্ত্রণার ভিতর থেকেই উঠে আসে মূলত। তীব্র যন্ত্রণা। দেশভাগের যন্ত্রণা তো সত্যি বলতে বেশি ভোগ করেছেন এপার বাংলায় চলে আসা মানুষগুলোই। তাই, তা নিয়ে এদিককার লোকের লেখাই বেশি...

পরিচালনা, অভিনয় নাকি ছবির গল্পটা লেখা, কোনটা উপভোগ করেন সবথেকে বেশি? 

তিনটেই উপভোগ করি। তিনটে কাজকে তিনরকমভাবে উপভোগ করি, এমনটাও বলা যায়। অভিনয় আমার খুব ভালোবাসার একটি জায়গা। খুবই ভালোবাসার। 

ভালোবাসাটা টের পাওয়া যায় আপনার স্ক্রিন প্রেজেন্সে...

খুব ভালো কথা বলেছ এটা। স্ক্রিন প্রেজেন্স নামটা যে লোকে দেয়, আসলে তো সেটা ভালোবাসাই...

আর, বাবা কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায় ছেলের অভিনয় নিয়ে কী বলছেন? রসগোল্লা তো মানুষের মনে দারুণভাবে জায়গা করে নিয়েছে...

খুব আনন্দ হচ্ছে। উজান নিজের ছেলে বলে বলছি না কথাটা। যে পরিশ্রম ও করেছে ছবিটার জন্য, তার ফল পাচ্ছে দেখে খুব ভালোলাগছে। অবন্তীকাও অসামান্য। তবে, যার সবথেকে বেশি কুর্নিশপ্রাপ্য, সে হল ছবিটির পরিচালক- পাভেল। কী দারুণ একটা ছবি বানিয়েছে ও! এই ছবিটা কিন্তু থেকে যাবে...


 


বাংলা ভাষায় বিশ্বের সকল বিনোদনের আপডেটস তথা বাংলা সিনেমার খবর, বলিউডের খবর, হলিউডের খবর, সিনেমা রিভিউস, টেলিভিশনের খবর আর গসিপ জানতে লাইক করুন আমাদের Facebook পেজ অথবা ফলো করুন Twitter আর সাবস্ক্রাইব করুন YouTube
Advertisement
Advertisement
Listen to the latest songs, only on JioSaavn.com