হোমআঞ্চলিক

"আমেরিকা বলুন বা ভারত, সমকামিদের লড়াইটা সব দেশেই কঠিন": চিকে ফ্র্যাঙ্কে এদোজিয়েন

  | February 18, 2019 14:10 IST
Chike Frankie Edozien

নাইজিরিয়ার প্রথম সমকামি লেখক হিসেবে নিজের স্মৃতিকথা লিখলেন লেখক-সাংবাদিক চিকে ফ্র্যাঙ্কে এদোজিয়েন। বইটির নাম- লাইভস অব গ্রেট মেন। সম্প্রতি কলকাতায় এসেছিলেন তিনি। শুনলেন এই শহরের সমকামিদের জীবনের গল্প। NDTV Bangla-র হয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বললেন বোধিসত্ত্ব ভট্টাচার্য।

বোধিসত্ত্ব: এই প্রথমবার ভারতে এলেন আপনি?

চিকে ফ্রাঙ্কি এদোজিয়েন: হ্যাঁ। আসলে ভারত নিয়ে বহু কথা শুনে এসেছি ছোটবেলা থেকেই। এছাড়া, ভারত সম্বন্ধে আমার নিজের কিছু পড়াশোনাও ছিল বরাবর। সেই পড়াশোনাটাও ভারতে আসা এবং আসার পরেই দেশটাকে ভালোবেসে ফেলার ব্যাপারটিকে ত্বরান্বিত করেছে বলে মনে হয়। বহুবার অনেকের মুখ থেকে শুনেছি, এই দেশের মধ্যে এক অতি রোধ ঝলমলে প্রাণ লুকিয়ে রয়েছে। সেই প্রাণটির কাছে পৌঁছনোর টানেও আসার ইচ্ছে ছিল অনেকদিন ধরেই। অবশেষে, সেই সুযোগ এল।

আসার পর দেশটাকে কতটাকে দেখলেন? দেখার পর কী মনে হচ্ছে?

সত্যি বলতে, দেশটাকে এখনও পর্যন্ত দেখেছি অল্প। এত বিশাল দেশকে এইটুকু সময়ের মধ্যে দেখা সম্ভব নয়। তাই, ‘দেখার পর কী মনে হল বা হচ্ছে' এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জায়গায় আমি এই মুহূর্তে নেই। তবে, নিশ্চয়ই, বেশ কয়েকবছর পরে এই প্রশ্নটা করলে তার একটা সন্তোষজনক উত্তর আপনি আমার থেকে পেতে পারেন!


আপনি খেতে ভালোবাসেন। কলকাতায়ও এলেন প্রথমবার। এখানকার খাবার কেমন লাগছে?

আমি না, অনেকরকম খাবার খেলাম হোটেলে। কোনওটা ঝাল-মশলা দেওয়া, কোনওটা সেদ্ধ, কিন্তু আলাদা করে কলকাতার খাবার বলে ওগুলোকে আমি চিহ্নিত করতে পারব না। তাই আমি বলতে পারব না যে, কলকাতার খাবারই খেয়েছি কি না, বা খেলেও, সেটা কেমন লেগেছে! তবে, আপনি এই প্রশ্নটা করায় ভালো হল। আমি এই শহরে এরপর যা-ই খাই না কেন, জেনে নিতে চাইব যে, ওটা কলকাতার খাবার কি না! বাঙালিরা খেতে তো খুব ভালোবাসে, তাই না?

হ্যাঁ! সেরকমই কথিত আছে!

সেটা বুঝেছি। আমি গাড়ি করে আসার সময় অনেক ফুটপাথে দেখছিলাম লোকে দাঁড়িয়ে বা বসে খাচ্ছে। একটা দারুণ স্ট্রিট ফুড কালচার রয়েছে যা বুঝলাম।

আপনার বই ‘লাইভস অব গ্রেট মেন' প্রথম কোনও নাইজেরিয় সমকামীর লেখা স্মৃতিকথা। সমকামি হিসেবে শুধু নাইজেরিয়া নয়, আপনাকে গোটা আফ্রিকারই অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধি বলে মনে করা হয়ে থাকে। অর্থাৎ, একটা লড়াই ছিল। লড়াইয়ের ঠিক কোন জায়গা থেকে মনে হল যে, সমকামি হিসেবে আপনার কথাগুলোও মানুষের কাছে পৌঁছে যাওয়া দরকার?

আপনার নয়। বলুন, আপনাদের। নিজের কথাটাকে পৌঁছে দেওয়া অবশ্যই দরকার। কিন্তু সেটাই সম্পূর্ণ লড়াই নয়। সেটাকে বড়জোর ‘যাত্রাশুরু' বলা যেতে পারে।‘লড়াই' শুরু হয় তখনই, যখন আমার একার স্বরটিকেই আমি বহু-র মধ্যে আবিষ্কার করে ফেলছি বা প্রবাহিত করতে পারছি। এবং, একইসঙ্গে বহু-স্বরকে নিয়ে আসতে পারছি আমার নিজের ভিতরে। এই পুরো প্রক্রিয়াটায় আমি বিশ্বাস করি। সেই কারণেই ‘আমার'-এর থেকে ‘আমাদের' বলাতেই বেশি স্বচ্ছন্দবোধ করি।

বেশ...

এবার লড়াইয়ের কথাটা বলি। আমাকে খুব অল্পবয়সে নাইজিরিয়া ছাড়তে হয়। ১৯ বছর বয়সে। আমি আমেরিকা চলে আসি। এই দেশে এসেই পড়াশোনা করি। নিজের কেরিয়ার শুরু করি। নাইজিরিয়াতে সমকামিতা নিয়ে আমাদের যে লড়াইটা ছিল, তা শুধু সমকামিতার সঙ্গেই নয়। তার সঙ্গে ছিল শিক্ষার অভাবের সঙ্গেও লড়াই। যে কোনও লড়াইয়ের ময়দানে নামার আগে নিজেকে প্রস্তুত করে তোলার জন্য যে শিক্ষাটা প্রয়োজন, তা আমেরিকায় এসে আমাকে নিতে হল। আমেরিকার সমাজকে উপর উপর দেখতে যত ঝাঁ-চকচকে মনে হোক না কেন, এখানে আবার বর্ণবিদ্বেষের সঙ্গেও লড়াইটা চালাতে হয়। কলেজ জীবনেই কয়েকজনকে পেয়েছিলাম। তাঁদের সবাই যে সমকামি, তা নয়। কিন্তু, লড়াইটাতে পেয়েছিলাম। না পেলে আমি এতদূর পৌঁছতে পারতাম না।

আপনি তো সাংবাদিকতা নিয়ে শিক্ষকতা করেন। একজন সাংবাদিক হিসেবেই বা কীভাবে দেখেন নিজের লড়াইটাকে?

সাংবাদিকতার শিক্ষক ও ছাত্র হিসেবে আমি পুরো লড়াইটাকে আসলে দেখি সিসিটিভি ক্যামেরার মতো করে। যখন আমি লেখক, তখন সেই ক্যামেরাটাই একটা 'মানুষের চোখ' হয়ে ওঠে। 

স্মৃতিকথা ছাড়াও এই নিয়ে কি কোনও গল্প লিখেছেন আপনি? নিজের জীবনে দেখা লড়াইগুলি নিয়ে একটি কাহিনি রচনা করা কতটা সহজ বা কঠিন?

খুব কঠিন নয়। দেখুন, লেখার সময়, তা আপনি যা-ই লিখুন না কেন, আপনাকে পুরো ব্যাপারটাই একটু নির্মোহভাবে দেখতে হবে। একটু দূর থেকে দেখতে হবে। নইলে লেখকের নিরপেক্ষতা বলে যে ব্যাপারটি আছে, তা লেখায় ফুটে উঠবে না। সেটা না থাকলে লেখার কোনও মানে নেই। তাই, আমি নিজেকে নিয়েই লিখেছি ঠিকই, কিন্তু, সেই হিসেবে দেখতে গেলে, আবার নিজেকে নিয়ে লিখিওনি। 

কলকাতায় এসে এখানকার সমকামিদের সঙ্গে কথা বললেন আপনি। কেমন লাগল? লেখক এদোজিয়েন এই কথাবার্তাকে কীভাবে দেখছেন?

ভীষণ পজিটিভভাবে। আমি তাঁদের লড়াইয়ের গল্পগুলো শুনলাম। আসলে, কী জানেন, লড়াইটা তো বদলে বদলে যায়। তা নির্ভর করে অনেককিছুর ওপরে। কোন সময়ে দাঁড়িয়ে আমি লড়াইটা করছি, কোন সমাজের মধ্যে থেকে আমি লড়াইটা করছি, কোন শিক্ষাটা নিয়ে আমি লড়াইয়ের ময়দানে নামলাম- এই সবকিছুর ওপর। আমি ভীষণ ইন্টারেস্টিং কিছু ঘটনা শুনলাম কলকাতায় এসে। এখানে বসবাস করা সমকামিদের মুখ থেকে। এমন বেশ কিছু ঘটনা, যা আবার আমেরিকা বা নাইজিরিয়াতে ঘটতে পারে কখনও, তা ভাবাই যায় না। আমি এই ঘটনাগুলিকে আমার লেখায় নিয়ে আসতে চাই ভবিষ্যতে। কয়েকটা ঘটনা তো ভীষণ স্ট্রাইকিং। 

আপনি কি জানেন, আমাদের দেশে মাত্র কয়েকমাস আগে সেই ব্রিটিশ আমলে তৈরি সমকাম-বিরোধী আইন নিষিদ্ধ করল সুপ্রিম কোর্ট?

জানি তো! সেই আইনটি বলবৎ থাকাকালীন কী অদ্ভুত সব ঘটনার সম্মুখীন হতে হয়েছে সকলকে! শুনছিলাম। যত শুনছিলাম, ততই অবাক হচ্ছিলাম! একটা প্রাগৈতিহাসিক আইন ভারতের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশে এতদিন ধরে টানা হচ্ছিল কেন কে জানে! এর কোনও মানেই নেই। তবে, শুধু আইন বদলটাও কোনও সমাধান নয়। যেটা সবথেকে কঠিন, তা হল ভাবনায় বদল আনা। সেটা কি সম্ভব হয়েছে বা অদূর ভবিষ্যতে হবে? এখনও তো শুনলাম, অনেক প্রাপ্তবয়স্ককে তাঁদের বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে স্রেফ সমকামি বলে। আমাদের লড়াইটা এখানেও চলছে। চলবেও। ট্যাবুগুলো ভেঙে ফেলা সবার আগে দরকার। নতুন কিছু স্বপ্ন দেখতে গেলে যা সবসময়ই সবথেকে বেশি জরুরি। 

  


বাংলা ভাষায় বিশ্বের সকল বিনোদনের আপডেটস তথা বাংলা সিনেমার খবর, বলিউডের খবর, হলিউডের খবর, সিনেমা রিভিউস, টেলিভিশনের খবর আর গসিপ জানতে লাইক করুন আমাদের Facebook পেজ অথবা ফলো করুন Twitter আর সাবস্ক্রাইব করুন YouTube
Advertisement
Advertisement
Listen to the latest songs, only on JioSaavn.com