হোমআঞ্চলিক

‘মৃদু ধমকে মহানায়ক বলেছিলেন, যা সহ্য হয় না তা খাওয়া কেন!’ লিলি চক্রবর্তী

  | July 24, 2019 09:21 IST (কলকাতা)
Bengali Veteran Actress

মধুমোত্তম, পুরুষোত্তম উত্তম

এত বড় মাপের মানুষ কিন্তু একটুও বুঝতে দেননি। উল্টে, আমাদের মতো নতুনদের হাতে ধরে শিখিয়ে দিতেন, কীভাবে অভিনয় করলে ন্যাচারাল অ্যাক্টিং হবে। অভিনয়টা অভিনয় বলেই মনে হবে না। আস্তে আস্তে আমার ভয় ভাঙল। যেহেতু ছবিতে আমি ওঁর বন্ধুর বউ তাই সেট থেকে সেই যে ‘বউঠান’ বলে ডাকতে শুরু করলেন শেষ দিন পর্যন্ত ওই ডাকটাই ধরে রেখেছিলেন।

মহানায়ক (Mahanayak Utatm Kumar) মানেই অভিনয়ের শিক্ষাগুরু। মহানায়ক মানেই সস্নেহ ধমক। মহানায়ক মানেই অল্প প্রশ্রয়। মহানায়ক মানেই সবার প্রতি সজাগ-সমান দৃষ্টি। মহানায়ক মানেই আজীবন 'বউঠান'। বঙ্গজীবনের এই অঙ্গ আর কী দেয়ানেয়া, ভোলা ময়রা-র সহ অভিনেত্রী লিলি চক্রবর্তীর কাছে? অন্তরঙ্গ আড্ডায় এনডিটিভি-কে জানালেন লিলি চক্রবর্তী (lily chakraborty)----

১৯৬৩ সাল। পরিচালক সুনীল বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘দেয়া নেয়া' ছবিতে উত্তম কুমারের বন্ধুর স্ত্রী-র ভূমিকায় অভিনয়ের অফার পেলাম। তার আগে দু-একটি ছবি করেছি। কিন্তু মহানায়কের সঙ্গে নয়। ফলে, একটু জড়োসড়ো হয়ে থাকব, টেনশন হবে---এটাই স্বাভাবিক। সামনে যেতেই দেখি, সব খুব নর্মাল। যেন মাটির মানুষ উত্তমকুমার। এত বড় মাপের, কিন্তু একটুও বুঝতে দেননি। উল্টে, আমাদের মতো নতুনদের হাতে ধরে শিখিয়ে দিতেন, কীভাবে অভিনয় করলে ন্যাচারাল অ্যাক্টিং হবে। অভিনয়টা অভিনয় বলে মনে হবে না। আস্তে আস্তে আমার ভয় ভাঙল। যেহেতু ছবিতে আমি ওঁর বন্ধুর বউ তাই সেট থেকে সেই যে ‘বউঠান' বলে ডাকতে শুরু করলেন শেষ দিন পর্যন্ত ওই ডাকটাই ধরে রেখেছিলেন।

স্কুলের টিচাররা পরীক্ষার আগে প্রশ্ন জানিয়ে দিতেন': গৌরব চট্টোপাধ্যায়

তখনকার প্রজন্মে বলুন বা এখনকার, সবারই একটা কৌতূহল ছিল উত্তমকুমারকে নিয়ে। যে মানুষটা পর্দায় এতটাই রোম্যন্টিক তিনি কি বাস্তবেও তেমনটাই? আমি বলব, উনি পর্দায় যা করতেন সেই অনুভূতি কখনও বাস্তবে বয়ে বেড়াতেন না। রোম্যান্টিক নায়ক কখনোই অভিনয়ের বাইরেও নায়িকাদের সঙ্গে সেটে প্রেম করতেন না। যে যেমন ব্যবহার করতেন তাঁকে ঠিক সেটাই ফেরত দিতেন দাদা। আমার অভিনয় জীবনের শুরু থেকে আমাকে চিনতেন। বিয়ের পর অভিনয়ে আসি। তাই আমার স্বামীকেও জানতেন। আমার স্বামী তো ওঁর অন্ধ ভক্ত ছিলেন। তাই ওঁকে চিনতেন, জানতেন বলেই ওঁর সঙ্গে অভিনয় করতে দিতে কোনোদিন ভয় পাননি বা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেননি। আমারও প্রথম দিন থেকেই উত্তমকুমারের ওপর শ্রদ্ধা মিশ্রিত সম্মান ছিল। প্রেম করব মহানায়কের সঙ্গে! এমন ভাবনা কস্মিনকালেও ঠাঁই পায়নি মাথায়! 


t6ged2mo


'দেয়া নেয়া'র পর 'ভোলা ময়রা' করেছি দাদা-র সঙ্গে। সেই ছবিতে আমি ওঁর নায়িকা। তখনও ওঁর কোনও অন্যরকম ব্যবহার দেখেনি। অভিনয় ফুরোলেই সেই বউঠান বলে ডাক। আসলে উনি মানুষ চিনতেন। কাকে, কী করা উচিত না উচিত সেটা ভালো বুঝতেন বলেই বোধহয় এই ব্যবহার ওঁর থেকে পেয়েছি। দুটো ছবির সেটেই দেখেছি গল্প করতে করতে কেমন নিজের চরিত্রে ঢুকে পড়তেন। এটা উনি বলেই পারতেন, এত সহজে। আর একটা মানতেই হবে, ওঁর মতো সুপুরুষ খুব কম দেখেছি। ধুতি-শার্টেও যেমন অতি উত্তম, বিদেশই পোশাকেও তেমনই স্মার্ট। আসলে পোশাক, সাজ খুব ভালো ক্যারি করতে জানতেন।

উত্তমকুমারের গুণের শেষ ছিল না। কী ভালো রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতে পারতেন! একবার আমি, বাসবী, রাজশ্রী, আরও সবাই মিলে রবীন্দ্রসদনে একটা অনুষ্ঠান করেছিলাম। ঋতুমঙ্গল ধাঁচের। চারটি ঋতু নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান গেয়েছিলাম আমরা। উনি সেখানেও ছিলেন আমাদের নায়ক। তখন সামনে থেকে োঁর গান শোনার সৌভাগ্য হয়েছিল। রবীন্দ্রসঙ্গীত ওঁর গলায় অদ্ভুত খুলত। আর খুব দিলদরিয়া মাুষ ছিলেন। খাওয়াতে খুবই ভালোবাসতেন। সেটা একা দাদা নন, বেণুদিও। সেটে দাদা-র জন্য বেণুদি রান্না করে নিয়ে আসতেন। সেসব থেকে ভাগ দিতেন আমাকে। অনুষ্ঠানের রিহার্সালের সময় যখন বিকেলে ওঁদের বাড়িতে আমরা যেতাম, নানা রকমের খাওয়াদাওয়া ছিল মাস্ট। দাদা সবসময় বেণুদিকে বলতেন, আমার বাড়ি থেকে কেউ যেন শুধু মুখে ফিরে না যায়।

উত্তমকুমারকে ঘিরে কত স্মৃতি! ২৪ জুলাই এলেই সেগুলোকে যেন সময়ের ধুলো ঝেড়ে নামাই। নেড়েচেড়ে দেখি। আবার যত্ন করে তুলে রাখি। এগুলোই তো অমূল্য সম্পদ! যেমন, দাদা কোনোদিন কাউকে ছোট নজরে দেখতেন না। সবাই তাঁর চোখএ সমান ছিল। তিনিই প্রথম প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন টেকনিশিয়ানদের ভালো ভাবে খাওয়ার না দেওয়ার জন্য। একদিন শালপাতায় করে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খেতে দেখে ভীষণ রেগে গিয়েছিলেন। বলেছিলেন, 'ওঁরা কি মানুষ নন! এভাবে খাওয়া যায়! শিগগিরি ওঁদের জন্যে বসে খাওয়ার ব্যবস্থা চাই। সঙ্গে প্রত্যেকের আলাদা থালা-বাসন। না হলে কাজই করব না।' দাদার সেই ধমকে কাজ হয়েছিল। তার কয়েকদিন পরেই দাদা যা বলেছিলেন সেই মতো ব্যবস্থা হয়েছিল টেকনিশিয়ানদের।

আর একটা মজার কথা বলি? একবার ইন্দ্রপুরী স্টুডিওতে আমরা সবাই বসে। একদিকে পরিচালক, উত্তমদা, বিকাশ রায়ের মতো দিকপালেরা। আরেকদিকে বেণুদি, আমি আরও অনেকে। লাইটের সেটিং হচ্ছে। সময় লাগছে বলে আড্ডায় মারছি। তখন আমি মুম্বই ফেরত। একটু পান-জর্দা খাওয়া ধরেছি। হঠাৎ বেণুদি বললেন, লিলি পান খাবি? সঙ্গে সঙ্গে রাজি। দোকান থেকে জর্দা দেওয়া পান এল। কাগজে মুড়িয়ে আলাদা করে ১২০ জর্দাও এল।  আমি পাকামি মেরে জর্দা পান খাওয়ার পরে আবার জর্দা খেলাম। আর যায় কোথায়! ডবল ডোজে আমার তখন মাথা ঘুরছে। বমি পাচ্ছে। নিতাইদা বলে একজন টেকনিশিয়ান ধরে ধরে ভেতরে নিয়ে গিয়ে শুইয়ে দিয়ে বললেন, পাখার বাতাস করি দিদি। আপনি শুয়ে থাকুন। সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু ঠিক আর হই কই? ইন্দ্রপুরী স্টুডিও-র অনেকগুলো দরজা ছিল। এভাবেই বিছানায় শুয়ে যখন ছটফট করছি দেখি পেছনের দরজা দিয়ে উত্তমদা ঢুকলেন। আমার অবস্থা দেখতে। দাঁড়াননি একটুও। হেঁটে যেতে যেতে বললেন, 'যা সহ্য হয় না তা খাওয়া কেন!' তারপর বেণুদিকে পাঠালেন।

৬০ বছর পরেও ধুতি-শার্ট পরা হেমন্ত-এর গলা দিয়েই ঝরে বসন্ত

বেণুদি এসে আমায় নিয়ে গেলেন ড্রেসিং রুমে। সেখানে গিয়ে বসতেই হুড়হুড়িয়ে বমি করলাম। তারপর যেন শান্তি হল। আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। আমার অবস্থা দেখে ব্রেক দেওয়া হয়েছিল আমায়। প্রায় ঘণ্টা চারেক টানা ঘুমোনোর পর যখন উঠলাম তখন ঝরঝরে। আর পেট জ্বলছে খিদেয়। খাবার চাইতেই দেখি গরম গরম খাবার আমার সামনে ধরলেন এক টেকনিশিয়ান দাদা। অবাক হয়ে তাকাতেই বললেন, দাদা-র কড়া হুকুম। বলেছেন, 'লিলির শরীর খারাপ। ওকে একদম ডাকবে না। আর ঘুম ভাঙার পর খেতে চাইলে ভালো করে খেতে দেবে। গরম করে। ঠান্ডা, পান্তা যেন খেতে দিও না!'

......এমনটাই ছিলেন আমাদের মহানায়ক উত্তমকুমার। ৪০ বছরেও এমন কাউকে আর পেলাম না! 

অনুলিখন: উপালি মুখোপাধ্যায়


বাংলা ভাষায় বিশ্বের সকল বিনোদনের আপডেটস তথা বাংলা সিনেমার খবর, বলিউডের খবর, হলিউডের খবর, সিনেমা রিভিউস, টেলিভিশনের খবর আর গসিপ জানতে লাইক করুন আমাদের Facebook পেজ অথবা ফলো করুন Twitter আর সাবস্ক্রাইব করুন YouTube
Advertisement
Advertisement