হোমমিউজিক

"আমি কোনও শিল্পী নই। আমি কেবলই সঙ্গীতের ছাত্রী": কৌশিকী চক্রবর্তী

  | December 10, 2018 15:31 IST
Kaushiki Chakaraborty

শহরে শুরু হতে চলেছে তর্কযোগ্যভাবে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অন্যতম সেরা মহাযজ্ঞ- স্বারা সম্রাট ফেস্টিভ্যাল। উস্তাদ আলি আকবর খানকে উৎসর্গীকৃত এই কনসার্টের মূল উদ্যোক্তা পণ্ডিত তেজেন্দ্রনারায়ণ মজুমদার। সঙ্গে রয়েছেন এই শহর তথা দেশের শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বহু তাবড় তাবড় শিল্পী। রয়েছেন কৌশিকী চক্রবর্তীও। NDTV Bangla'র হয়ে তাঁর সাক্ষাৎকার নিলেন বোধিসত্ত্ব ভট্টাচার্য।

সঙ্গীতশিল্পী কৌশিকী চক্রবর্তী এই মুহূর্তে কেমন আছেন?

নট ইয়েট (হাসি)। এখনও 'সঙ্গীতশিল্পী' হতে পেরেছি বলে মনে হয় না আমার। আমি সঙ্গীতের ছাত্রী থাকতে পেরেই আনন্দিত। কারণ, আমি 'সঙ্গীতশিল্পী' দেখেছি। সত্যি সত্যিই যদি কেউ 'সঙ্গীতশিল্পী' হন, মানে যে জায়গাটায় পৌঁছতে পারলে সেই তকমাটা তাঁদের দেওয়া যায়, তেমন একটি জায়গায় আমি এখনও পৌঁছতে পারিনি বলে 'সঙ্গীতশিল্পী' তকমাটা আমার জন্য কোনওভাবেই প্রযোজ্য নয়, এমন একটি ব্যাপার আমি বুঝতে পেরেছি, তাতেই আমি খুশি। 

এটা তো পরিষ্কার বিনয়...একজন শিল্পীরই বিনয়।

একেবারেই নয়। এটা সত্যিই। এটা হয়তো বিনয়ের মতো মনে হয়, কিন্তু একদমই আমি যেটা ভাবি, তা বললাম। দেখুন, শিল্পী ব্যাপারটা ওভাবে তৈরি হয় না। এটা ম্যানুফাকচার করা যায় না। সঙ্গীতের কারিগর বা সঙ্গীতশিল্পীর মধ্যে তাই একটু তফাৎ আছে। শিল্পী জন্মায়। তার শৈল্পিকবোধটা তার ভিতরেই থাকে। কেবল সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে পরিস্থিতি, শিক্ষা, সংস্কারের মতো বিষয়গুলির দ্বারা জারিত হয়ে সেই বোধটি আনফোল্ড করে। তৈরি হয় না। গানবাজনা করা আর গানবাজনা হওয়ার মধ্যে একটু তফাৎ আছে। আমি 'সঙ্গীতশিল্পী' কি না, তা হতে পারলাম কি না বা ভবিষ্যতে হতে পারব কি না, এটা না আমি বলতে পারি না অন্য কেউ বলতে পারে। এটা কাসটম-মেড নয়, এটা অর্ডার করা যায় না, এটা কিনে আনা যায় না, এটা পরিবারে থাকলে হয় না... অনেককিছু একসঙ্গে মিলে গেলে হাতেগোনা কয়েকজন মানুষের ক্ষেত্রে হয়। না হলেও দুঃখ নেই। আমি একটা জিনিস ভালোবাসি, তা-ই করে চলেছি, সেটাই বা কম কীসের!


ভালো থাকার 'বেসিক' মন্ত্র শেখাতে এল রসগোল্লা বন্দনাগীতি!

আপনি যে কথাগুলো বলছেন, শিল্পবোধ খুব গভীরে প্রোথিত হয়ে না থাকলে এগুলো তো বলা যায় না...

সেই বোধটি ভিতরে আছে কি নেই, তেমনটাও আমি নিজের ক্ষেত্রে দাবি করতে চাই না। আমি সত্যিই বলছি।

এত প্রবল বিনয় করলে সাক্ষাৎকার নেওয়া তো রীতিমতো মুশকিল! 

হাহাহা! দেখুন, আমার দাদু একটা কথা বলতেন। যে গাছে অনেক ফলফুল হয়, তা একটু নুইয়ে থাকে। ফলফুল হল, অথচ তা নুইয়ে গেল না, এমন হওয়া বেশ শক্ত। পার্সপেক্টিভ রেশিও বলে একটা জিনিস হয়। আপনি যদি খুব দূর থেকে এভারেস্ট দেখেন,  মনে হবে খুব বড় একটা পাহাড়। আপনি যদি আরেকটু কাছে যান, মনে হবে, কী বিশাল! আরও একটু যদি কাছে যান, মনে হবে, এত বিশালত্বের সামনে আমি কী! আমি তো ক্ষুদ্রস্য ক্ষুদ্র! আপনি যদি বেসক্যাম্প অবধি পৌছান না, তাহলে আর কিছু ভাবতে পারবেন না। ভাষা পাবেন না। কারণ, তখন আপনি এবং আপনার ভাষা এতটাই ইনসিগনিফিক্যান্ট হয়ে গিয়েছে যে, আপনি কী বললেন বা কী ভাবলেন, তখন আর তা ম্যাটার করছে না। এভারেস্ট রয়েছে এভারেস্টের মতো, আপনাকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কোনও একটি বিষয়কে যদি ভালোবাসা যায়, কোনও একটি মানুষকেও যদি ভালোবাসা যায় মন থেকে, তাহলে তার সত্তার সামনে, সেই ভালোবাসার বিশালত্বের সামনে হারিয়ে যাওয়াটাই  তো একটা আনন্দ। 

শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের এই নির্দিষ্ট অনুষ্ঠানটির সঙ্গে আপনি যুক্ত হলেন কেন?

এই অনুষ্ঠানটি যাঁর নামে হচ্ছে, সেই উস্তাদ আলি আকবর খাঁ আমার এক ঈশ্বর। আমি ছ'বছর বয়সে ওঁর কোলে বসে গান শুনিয়েছি, গল্প করেছি, কথা বলেছি...মানে একদম একটা ফালতু বাচ্চা যেরকম  করে বা করতে পারে, সেইসবই করেছিলাম। তা নিয়ে অবশ্যই আমার লজ্জার শেষ নেই! তাঁর সরোদ শুনে আমি বড় হয়েছি। কিন্তু তাঁর শিল্পকে যে আমি খুব বুঝতে পেরেছি, তা নয়। অতটা যোগ্যতা আমার হয়েছে বলে বিশ্বাস করি না। আর, আরেকটা ব্যাপার কী জানেন, এই অনুষ্ঠানের সঙ্গে যাঁরা যুক্ত, তাঁদের প্রত্যেকের প্রতি আমার শ্রদ্ধা, আমার ভক্তি কোনওদিন কমার নয়। বরং, প্রতিদিন তা নতুন করে বেড়েই চলে। তেজেন কাকু (পণ্ডিত তেজেন্দ্রনারায়ণ মজুমদার) আর কাকিমা আমাকে জন্মাতে দেখেছেন। আমি তাঁদের কোলেপিঠে,  তাঁদের স্নেহে-আদরে মানুষ। তাই, এই অনুষ্ঠানটিকে একদম আপন করে নেওয়া ছাড়া আমার আর কিছুই করার নেই। আমার বাড়ি খালি।  ন'বছরের বাচ্চাকে তার শিক্ষকের কাছে রেখে এখানে চলে এসেছি। আসলে আমার এখানে আসতেই হত। 

মফসসল থেকে শহরে দুই কিশোর, হোটেলে এক রাত বদলে দিল জীবন

আপনার ছেলের কথা বললেন। এই জায়গা থেকেই একটি প্রশ্ন। এই প্রজম্ম কি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত নিয়ে কোনওভাবে উৎসুক? 

এই প্রশ্নটি একটু গভীর। আমি আমার মতো করে উত্তরটা দিচ্ছি। আমি গানবাজনা কেন ভালোবেসেছি, এর উত্তরটা যদি হয়- আমাকে ছোটবেলা থেকে গানবাজনার অনুষ্ঠানে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, জন্মদিনে ক্যাসেট কিনে দেওয়া হচ্ছিল, বাড়িতে সবসময় গানবাজনার পরিবেশ যাতে বজায় থাকে সেই চেষ্টা করা হচ্ছিল, বাবা-মা'র সঙ্গে গানবাজনা নিয়ে আলোচনার একেবারে উদার একটি পরিসর ছিল। তাহলে সেই জায়গা থেকে বিচার করে আমার প্রশ্নগুলো হবে, আমরা কী অভিভাবক হিসেবে নিজেদের সন্তানদের জন্য সেগুলো করছি? আমরা কি একজন সঙ্গীতশিল্পীকে নিজেদের বাড়িতে নেমন্তন্ন করে তাঁর জীবনের গল্প, তাঁর লড়াইয়ের গল্প নিজেদের সন্তানদের সামনে নিয়ে বসে শুনছি? উত্তরটা হল, না। আমরা এখন ছেলেমেয়েদের সঙ্গে 'কোয়ালিটি টাইম' স্পেন্ড করি। অর্থাৎ, সিনেমা দেখা, বাইরে খেতে যাওয়া, বছরে একটা কি দুটো বড় ট্যুর এইসব। এগুলো যে আসলে কিছুই না, এমনকি 'কোয়ালিটি' শব্দটাও যে এগুলোর সঙ্গে তেমন যায় না, সেটাও তো আমরা ছেলেমেয়েদের মনে ঢুকিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে যথেষ্ট উৎসাহীই নই। হয়তো, আমরা নিজেরাও জানি না আসলে! আমরা তো হোমওয়ার্ক হয়েছে কি না, পরীক্ষায় কেমন রেজাল্ট হল, টিউশনে ঠিকঠাক যাচ্ছে কি না ছেলেমেয়ে- এগুলো নিয়েই চিন্তিত। আমার বাবা আমাকে পড়া কামাই করে অনুষ্ঠান শুনতে নিয়ে গিয়েছেন। দেখতে দেখতে রাত দেড়টা বেজে গিয়েছে। ঘুমিয়ে পড়েছি। তারপর আমাকে জাগিয়ে তুলে যাঁর অনুষ্ঠান শুনতে এলাম, তাঁর সঙ্গে দেখা করানো। দেখা করানো মানে, প্রণাম করানো। একটি স্টেজে ওঠার আগে স্টেজটাকে প্রণাম করা। এগুলো আমাকে কেউ আলাদা করে শিখিয়ে দেয়নি তেমনভাবে।  এগুলো দেখে দেখে আমি শিখেছি। কখন যে শিখে গিয়েছি তা বুঝতে পারিনি। কখন যে তা জীবনের এবং নিজের অস্তিত্বেরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গিয়েছে, বুঝতে পারিনি তাও। আসলে কী জানেন, একজন মানুষ তার জীবনের সবথেকে বড় শিক্ষাগুলি অবচেতনেই শেখে।  ঘটনা হল, এই জীবনের অংশ যদি আমরা আমাদের ছেলেমেয়েদের করে তুলি, তাহলে গোলাপের চারা থেকে গোলাপই হবে, গাঁদা হবে না।

কিন্তু আপনি যে ধরনের পরিবার বা বেড়ে ওঠার কথা বলছেন, সেটা কি গানবাজনার চর্চা না থাকলে কোনও পরিবারে হওয়া সম্ভব? শুধু এই সময়টার কথা বলে বলছি না। আগেও কি তা ছিল? মেজরিটি তো চিরকালই পপুলার মিউজিকই শুনে এসেছে বেশি।

ঠিকই বলেছেন। মেজরিটি সবসময়ই পপুলার মিউজিক বেশি শুনেছে।  আর, আগের সময়টাতে একেবারে গানবাজনার চর্চা সাধারণ পরিবারের মধ্যে থাকত না, তাও কিন্তু না। একটা তানপুরা বা একটা হারমোনিয়াম একটা দীর্ঘ সময় ধরে প্রত্যেক বাঙালির ঘরেই থাকত৷ এর একটা বড় কারণ হল, গানবাজনা তো মূলত বিনোদন। তখন বিনোদনের এত উপকরণ এখনকার মতো হাতের কাছে মজুত ছিল না। আর, এখনকার প্রজন্ম পপুলার মিউজিক যদি বেশি শোনে। তাদের তো দোষ দেওয়া যায় না। পপুলার মিউজিশিয়ানদের ভিজিবিলিটি অনেক বেশি। একটা চার বছর বা পাঁচ বা ছ'বছরের বাচ্চা সে যদি সেই পপুলার আর্টিস্টকে দেখে নিজেও তাঁর মতো হতে চায়, তাহলে তাকে আমি দোষ দেব কী করে? প্রত্যেকেরই নিজের স্বপ্ন থাকে। সে যখন দেখছে, একজন পপুলার মিউজিশিয়ানের জনপ্রিয়তা একজন ক্লাসিক্যাল মিউজিশিয়ানের থেকে অনেক বেশি, অর্থ ও প্রতিপত্তিও প্রচুর, তাহলে সে তাঁর মতো হতে চাইতেই পারে। দিনের শেষে সে মিউজিকের সঙ্গেই তো যুক্ত। 

আপনি তো নিজে পপুলার সঙ্গীতের সঙ্গে জড়িত। বলিউডেও গান করেছেন...

হ্যাঁ! যেরকম যেরকম গান আমার কাছে এসেছে এবং ভালোলেগেছে, গেয়েছি। আমি যখন কোক স্টুডিওতে গাইলাম,  ওই সময়টায় লোকে ভাবছিল, এবার বোধহয় খেয়াল-তানপুরা সব ছেড়ে দিয়ে এখন এই গানই গাইবে কৌশিকী! এইটাই বোধহয় ও করতে চায় আসলে! তারপর তো বেশ কয়েক বছর কেটে গিয়েছে! এখন বোধহয় সকলেই বুঝে গিয়েছে, আমি তো বুঝেই গিয়েছি যে, আমি আর কিছুই করতে চাইছি না! আমি স্রেফ তানপুরাটা নিয়ে বসে রেওয়াজ করতে পারলে, নিজের গানটা গাইতে পারলেই খুশি! আর, আমি যে কাজটা করে সবথেকে আনন্দ পাই, সেই কাজটা যখন আমি করি, তখন তা শুনে লোকে লোকে আনন্দ পায়, এর থেকে বড় আনন্দের ব্যাপার আর কী আছে!

নতুন কিছু করার ইচ্ছে আছে আপনার গান নিয়ে? যেমনভাবে এর আগে কখনও করেননি, এমন কিছু?

এখনও সেটা ভাবিনি। আসলে কী জানেন, এখন সকলেই শুনি বলে 'নতুন' কিছু করছি বা 'অন্যরকম' করছি! আসলে আমরা কেউই নতুন কিছু করছি না। পুরনোগুলোই ঠিকভাবে করা হয়ে ওঠে না এখনও। নতুন কী করব! আসলে যা হওয়ার হয়ে গিয়েছে। সবাই তাঁর মতো করে হয়তো ভাবছেন, যে, এমনটা এর আগে হয়নি। তাঁর মতো করে ইন্টারপ্রেট করছেন। কিন্তু, পৃথিবীর সাঙ্গীতিক ইতিহাসে এমনটা আর কোনওদিনও কখনও ঘটেনি, ততটা কি আমরা জেনেই এই 'নতুন' বা 'অন্যরকম' শব্দগুলো ব্যবহার করছি! তাও তো একটা প্রশ্ন! এবার সেটা যদি মানুষের পছন্দ হয়, ঠিকভাবে নিতে পারে, ট্রেন্ড হয়, তাহলে তা থাকবে। ব্যাপারটা খুব সহজ। আমরা অযথা জটিল করে ফেলি। 

 


বাংলা ভাষায় বিশ্বের সকল বিনোদনের আপডেটস তথা বাংলা সিনেমার খবর, বলিউডের খবর, হলিউডের খবর, সিনেমা রিভিউস, টেলিভিশনের খবর আর গসিপ জানতে লাইক করুন আমাদের Facebook পেজ অথবা ফলো করুন Twitter আর সাবস্ক্রাইব করুন YouTube
Advertisement
Advertisement
Listen to the latest songs, only on JioSaavn.com