হোমআঞ্চলিক

"আমার দুর্বলতাটা ঢেকে আমি সত্যজিৎ রায় হওয়ার চেষ্টা করি না": অরিন্দম শীল

  | October 06, 2018 21:27 IST
Tollywood

বাংলা সিনেমাকে খোলনলচে বদলে দেওয়ায় তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। দর্শক আনুকূল্য এবং সমালোচকদের প্রশংসা- তাঁর ছবি দেখেছে এই সবটাই। তাঁর নতুন ছবি 'ব্যোমকেশ গোত্র' নিয় কথা বললেন পরিচালক অরিন্দম শীল। বললেন এই মুহূর্তে দেশের অবস্থা থেকে শুরু করে মরবিডিটি পর্যন্ত প্রায় সবকিছু নিয়েই। খোলামেলা সাক্ষাৎকারে তাঁর কথাগুলির সাক্ষী রইলেন বোধিসত্ত্ব ভট্টাচার্য।

[ সাক্ষাৎকারের প্রথম পর্বঃ "মেধা ও শিক্ষা না থাকলে এখন আর বাংলা সিনেমায় টিকে থাকা যায় না": অরিন্দম শীল ]

 

আজ দ্বিতীয় এবং অন্তিম পর্ব

আপনি যখন আপনার ছবির গল্পটা ভাবছেন বা ভাবেন, তখন গোটা ছবিটা কি চোখের সামনে ভিস্যুয়ালাইজ করতে পারেন? নাকি, কেবল কয়েকটা ছাড়াছাড়া দৃশ্য ভেসে ওঠে?


 

আমার কাছে গোটা ছবিটা চোখের সামনে দেখতে পাওয়াটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। আজ ‘ব্যোমকেশ গোত্র’র কালার প্যালেট নিয়ে মানুষ কথা বলছে, ওই লুকটা আসলে আমি নিজের চোখে দেখি। পোশাক থেকে শুরু করে, সেট ডিজাইন থেকে শুরু করে পুরোটাই…আমি আসলে একটু পুরনো ঘরানার লোক। সত্যজিৎ রায়ের ঘরানার মানুষ। আমার ছবিটা আমার অফিসের টেবিলে তৈরি হয় আসলে। এই যে টেবিলটার উল্টোদিকে আপনি বসে আছেন, এই টেবিলটা ইজ ভেরি সেক্রেড টু মি। আপনি দেখতে পাচ্ছেন, গোটা টেবিল এবং ঘর জুড়ে স্ক্রিপ্ট ও বইতে ভর্তি। আমি বেশিরভাগ সময়টাই এখানেই কাটাই। এই বইয়ের মধ্যে, এই স্ক্রিপ্টের মধ্যে এবং নিজের ভাবনাগুলোর মধ্যে। এই জায়গাটাকেই আপনি বলতে পারেন আমার সমস্ত ছবির আদত আঁতুড়ঘর।

 

 

 

আপনি নিজেকে বললেন ‘পুরনো ঘরানার লোক’, অথচ, আপনার সঙ্গে যাঁরা কাজ করেন, তাঁরা তো ভীষণ ইয়াং একটা গ্রুপ। তাঁদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে কোনও সমস্যা হয় না?

একেবারেই না। বরং উল্টো। আমার সঙ্গে কাজ করার কথা উঠলেই উৎসাহে ফুটে ওঠে ওরা। এমন একটা টিম রয়েছে আমার, যে টিমটা তাদের ডিরেক্টরের জন্য প্রাণ দিতেও রাজি। এবং, এটা কেবল কথার কথা নয়, কিন্তু। এর কারণ মূলত দুটো। এক, অরিন্দমদার সঙ্গে আমরা সবাই মিলে জোট বেঁধে কাজ করে ছবিটা তৈরি করলে একটা ফাটানো ছবি হয় এবং দুই, অরিন্দমদার সঙ্গে কাজ করলে আমাদের প্রত্যেকেরই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কন্ট্রিবিউশনের জায়গা থাকে ছবিটিতে। এটা আমার সঙ্গে যারা কাজ করে তারা প্রত্যেকেই বলে।

আপনি কি অভিনেতাদের পুরো স্বাধীনতা দেওয়ায় বিশ্বাসী? বা, দিলে ঠিক কতটা?

পুরোটা দিই না। অনেক সময় ধরেও রাখি! যেটা বলছিলাম তখন, যে, স্ক্রিপ্টটা সাজানোর সময়ই আমি বহু সিন ছবির মতো দেখতে পাই। সেই জায়গাটায় কাউকে কিছু করতে দিই না। এই জায়গায় বলে রাখি, আমাদের স্ক্রিপ্টটা কিন্তু বহু ঘাঁটাঘাটির পর, অন্তত দশ থেকে বারোটা ড্রাফট বানানোর পর ফাইনাল করা হয়। যে গল্পটার ওপর ভিত্তি করে আমরা ‘ব্যোমকেশ গোত্র’ করছি, সেই ‘রক্তের দাগ’ এমনিতেই বেশ জটিল একটা গল্প। বহু লেয়ার আছে তাতে। সেই গল্পটাকে ভাঙাচোরা করে, ওই লেয়ারগুলোকে আলাদা করে আইডেন্টিফাই করে সেই সময়ের পলিটিক্স, সেই সময়ের কালচার সমস্তটাকে এক জায়গায় নিয়ে এসে স্ক্রিপ্টে ফেলাটা বেশ পরিশ্রমের কাজ। এই পরিশ্রমের যে প্রক্রিয়াটা চলে, তার ভিতর দিয়েই  আমি ওই দৃশ্যগুলোকে পরিষ্কার ভিস্যুয়ালাইজ করতে পারি। তাই, ওই জায়গাটায় আমি যেটা চাই, সেটাই অভিনেতাদের দিয়ে করানোর চেষ্টা করি। আমার অভিনেতাদের ছাড়ার জায়গাটা নিয়ে বলি। আমার স্ক্রিপ্ট স্টেজ থেকেই কিন্তু আমার ছবির অভিনেতারা আমার সঙ্গে থাকে। যার ফলে, ছবিটা যখন ফ্লোরে যায়, তার অনেক আগে থেকেই, কী করতে হবে, সেটা অভিনেতাদের মগজে একদম গিঁথে যায়। ফ্লোরে যখন আমরা ছবিটা নিয়ে যাই, তখন কিন্তু ছবির সঙ্গে প্রত্যেকটি ব্যক্তি জানে যে, তার কাজটা কী। সেটা আমার ক্যামেরাম্যান জানে, আমার আর্ট ডিরেক্টর জানে, আমার ডিরেক্টরিয়াল টিম জানে…

এই ছবিতে অভিনয় করে অঞ্জন দত্ত কী বললেন আপনাকে? এই প্রশ্নটা করার কারণ হল, উনি নিজেও একজন পরিচালক। ক্যামেরার সামনে যখন দাঁড়াচ্ছেন, তখন আবার অভিনেতা। তবে, পরিচালক সত্তাটা তো কোথাও গিয়ে থেকেই যায়। সেই জায়গা থেকেই জানতে চাই…

 

অঞ্জনদা আমায় একটা এমন কথা বললেন ছবিটা করতে করতে, তা সত্যিই শেয়ার করার মতো। উনি বললেন, আমি বহুদিন বাদে এমন একজন পরিচালককে দেখলাম, যে এডিট পয়েন্টটা ভেবে নিয়ে শ্যুট করে। তা না হলে এই ডিজিটালের জমানায় তো সবাই তিনশো ষাট ডিগ্রি ঘুরে ঘুরে শ্যুট করে। একই শট দশবার করে নেয়। এটা টিটোদাও আমার সম্পর্কে বলেছিলেন। আমি যেটা শ্যুট করব, সেই শটটা ছবিতে রাখব বলে ভেবে নিয়েই শ্যুটটা করি। কারণ, ক্যামেরাটা এখান থেকে ওখানে কেন যাচ্ছে, ইট হ্যাজ টু বি জাস্টিফায়েড। আমার এডিটর সংলাপ ছবিটার সম্পাদনার পর আমাকে বলল, ‘অরিন্দমদা, আমি জীবনের শ্রেষ্ঠ ছবিটা কাটলাম। তার কারণ, ছবিটা এডিট টেবিলে আসার আগেই প্রায় পুরোটাই এডিটেড। তার মানে আমার কাজটা কতটা সহজ’। সংলাপ অ্যাজ অ্যান এডিটর দুর্ধর্ষ কিছু কন্ট্রিবিউশন করেছে। আর এই মুহূর্তে আমাদের ইন্ডাস্ট্রির অন্যতম সেরা এডিটর ও। সংলাপ ভৌমিক। অসাধারণ কাজ করেছে। আর, ও এই ব্যাপারটা পেয়েছিল বলেই হি গেভ অ্যান অ্যাডেড কন্ট্রিবিউশন টু দ্য ফিল্ম। আর, আমি এই কাজটা করতে অ্যালাও করি সবসময়। অন্তত, আমি যদি বুঝতে পারি যে, সংশ্লিষ্ট ব্যাপারটিতে সে দক্ষ এবং দারুণভাবে কাজটা করতে পারবে, তাহলে পরিচালক হিসেবে আমি অ্যালাও করব না-ই বা কেন। আফটার অল, ইট’স আ টিমগেম।

স্পিলবার্গের একটা ইন্টারভিউ কয়েকদিন আগে দেখছিলাম। যেখানে উনি বলছেন, ছবির শুটিং যখন করা হয়, তখন তা বেসিক্যালি অজস্র ফুটেজের সমাহার। এইভাবে ত্রিশদিন, চল্লিশদিন, পঞ্চাশদিন পার করার পর যখন আমরা ওই ফুটেজগুলো নিয়ে এডিট টেবিলে যাই, তখনই মনে হয়, দিস ইজ দ্য টাইম! লেটস মেক আ ফিল্ম! আপনি বলছেন ঠিক উল্টোটা। ছবিটা তৈরি শেষ হওয়ার পরই দেখা যায়, সেটা ইতিমধ্যে প্রায়-এডিটেড…

আমার এই টেবিলটাতেই একটা বই সবসময় থাকে। ওয়াল্টার মার্শের। বিশ্বের অন্যতম সেরা এডিটর। তাঁর বইটাকে আমি পুরো রুলবুকের মতো ফলো করি। আসলে আমি যেটা বলছিলাম, আমি নিজে একটু পুরনো ঘরানার লোক। অন্তত ফিল্ম বানানোর বিষয়ে তো বটেই। আমি এইভাবেই কাজ করতে ভালোবাসি। আমাকে যেটা সবসময় যেটা হন্ট করে যে, আমি যদি আমার এডিটরকে হাজার হাজার শট দিয়ে দিই, তাহলে কি সবসময় সে সেরা সিনটাই রাখতে পারবে? বা, এমনটাই রাখতে পারবে সবসময়, যা আমি চেয়েছিলাম পরিচালক হিসেবে? এটা কঠিন। খুব কঠিন। আমি আসলে সিনেমার ম্যাজিকটায় বিশ্বাস করি। আর, বিশ্বাস করি ইমপালসটায়। দেয়ার হ্যা টু বি আ ম্যাজিক। একটা চোখের পলক। একটা ইশারা। একটা মুভমেন্ট। দ্যাট ম্যাজিক। এই প্রত্যেকটা দৃশ্য আমি যখন তৈরি করি, আমি চাই যে, আমার শিল্পীদের মধ্যে থেকে একটা জেনুইন ম্যাজিক বেরিয়ে আসুক।

অভিনেতা হিসেবে কোনও আক্ষেপ কাজ করে আপনার মধ্যে? মনে হয় কি, বাংলা সিনেমা আমাকে আরও দারুণভাবে গ্রহণ করতে পারত?

কিছুটা তো আছেই। এখন অনেকে বলে, কী দুর্দান্ত করেছিলে অমুক জায়গাটা। বা, তুমি থাকলে আরও চমৎকারভাবে ফাটিয়ে অমুক চরিত্রের অভিনয়টা করতে। বা, যখন আমি কোনও চরিত্র বুঝিয়ে দিই অভিনয় করে আমার অভিনেতাদের, তখন ওরা বলে, কী চমৎকারভাবে দেখালে তুমি! এমনটা কেউ করতে পারে না। অথচ,, যখন আমি কেবল অভিনয়টাই করতাম, তখন তো এইসব বিশেষ শুনিনি। ইন্ডাস্ট্রির মধ্যেও ওই সময় আমাদের টেলিভিশনের অভিনেতা বলে খানিকটা দূরে সরিয়ে রাখার প্রবণতা ছিল। দিনের পর দিন শুনে এসেছি, টেলিভিশনের অভিনেতারা আবার সিনেমা করবে কী! অবশ্য, এই জায়গায় আমি পুরোপুরি দোষও দিতে পারি না ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিকে। কারণ, সময়টাই তখন ওরকম ছিল। এখন অভিনয় করাও কমিয়ে দিয়েছি অনেক। তবে, আমার ছবি, আমাদের ছবির অভিনয়ে যেন কোথাও খামতি না থাকে, সেটা খুব মন দিয়ে লক্ষ রাখি। ‘ব্যোমকেশ গোত্র’র প্রত্যেকটা চরিত্রে প্রতিটি অভিনেতা এবং অভিনেত্রী যে কী দুর্দান্ত অভিনয় করেছে, তা সিনেমাটা রিলিজ করার পরই বুঝতে পারা যাবে। অত্যন্ত ভালো অভিনয়। আর আমার অভিনয় সম্বন্ধে একটি কথা বলি, অঞ্জন দত্তর পরের ছবি ‘ফাইনালি ভালোবাসা’তে একটা চরিত্র পেয়েছি, যেটা আমার মতে, ‘চলো, লেটস গো’র পর আমার শ্রেষ্ঠ কাজ হতে চলেছে। এই দিক থেকে আমি আরও একটা কথাও বলতে চাই। অঞ্জন দত্ত এবং মৈনাক ভৌমিক- এই দুজনেই আমাকে দারুণ কয়েকটি চরিত্র দিয়েছেন।

আপনি দীর্ঘ দু’দশকের বেশি সময় ধরে ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়েছেন। এখন দাঁড়ান ক্যামেরার পিছনে। এই অবস্থান বদলের ফলে মাধ্যমটাকে দেখার চোখে কি কোনওরকম বদল এসেছে?

দেখার চোখে বদল তো এসেছেই। সেটা তো অবশ্যম্ভাবী। কেবল বদলেছে বলা যেতে পারে আমার কাজের ধরনটা। তবে, এক্ষেত্রে আরও একটা কথা বলার, আমি অভিনেতা বলেই বুঝতে পারি, একজন অভিনেতাকে পরিচালক হিসেবে ঠিক কীভাবে টেক কেয়ার করা উচিত আমার। আমার অভিনেতারাও তা-ই বলে। অরিন্দমদার ছবিতে যেভাবে প্যামপার্ড হই, যে যত্নটা নেওয়া হয় আমাদের প্রতি, তা খুব অল্প জায়গাতেই দেখেছি। আমি আসলে একজন শিল্পীর সাইডটা সবার আগে দেখি।

আপনি সাহিত্যের পাতা থেকে তুলে আনা কাল্পনিক চরিত্র নিয়ে কাজ করেছেন বেশি। ঘটনাচক্রে, দুটোই গোয়েন্দা চরিত্র। শবর ও ব্যোমকেশ। একটা কাল্পনিক চরিত্র নিয়ে ছবি তৈরি করা কতটা কঠিন একজন পরিচালকের পক্ষে? যেহেতু, দুটোই সাহিত্যের পাতা থেকে উঠে আসা চরিত্র, তাই আপনার ছবি কেবল দর্শকরাই নয়, দেখতে যাচ্ছেন ওই চরিত্রগুলো গুলে খাওয়া পাঠকরাও। এবার সেই পাঠকদের মধ্যে একজন হয়তো চরিত্রটাকে এক রকমভাবে ইন্টারপ্রেট করেছেন, আরেকজন আরেকরকমভাবে। আবার, আপনি হয়তো ইন্টারপ্রেট করেছেন সম্পূর্ণ অন্যরকমভাবে, আপনার নিজের মতো করে। আপনার ছবি হিট হচ্ছে মানে, এই সমস্তটাই কোথাও গিয়ে মিশে যাচ্ছে এক জায়গায়। এর কারণটা কী বলে মনে হয়?

ওটাই তো মজা! কাল্পনিক বলে একটা দারুণ শৈল্পিক স্বাধীনতা নেওয়ারও সুযোগ থাকে। অর্থাৎ, আমি ভাবতে পারি ব্যোমকেশের ছাতি ছেচল্লিশ ইঞ্চি। আবার, অন্যদিকে, আরেকজন ভাবছেন, ব্যোমকেশের ছাতি আটত্রিশ ইঞ্চি। তো, এই জিনিসটা হতে পারে। নিজের মতো কল্পনা করা যায়। চরিত্রটাকে নিজের মতো রঙ দেওয়া যায়। আর, এই পুরো ব্যাপারটাই কোথাও একটা গিয়ে আমার ভাবনার সঙ্গে বোধহয় দর্শকরা রিলেট করতে পারেন। তাঁদের ভাবনাটাও আমার ভাবনার সঙ্গে মিলেও যায়। তাই তাঁরা দেখেন। এটাও একটা ম্যাজিক (হাসি)। শবরের ক্ষেত্রেও এটা হয়। আমি ভাবি, যে দর্শক কী চাইতে পারেন। ব্যোমকেশের ওই সময়টায় আমি যাতে দর্শকদের ট্রান্সপোর্ট করতে পারি, সেই ভাবনাটাও কাজ করে মনের মধ্যে। এই প্রচেষ্টাটা আমার থাকে।

অঞ্জন দত্তের ব্যোমকেশ নিয়ে একজন দর্শক হিসেবে আপনার কী মত?

অঞ্জনদা নিজেই বলেছেন যে, ওঁর ব্যোমকেশটা খানিকটা অগাথা ক্রিস্টির ধরনের। খানিকটা সিট-কম টাইপ। ড্রয়িংরুম ড্রামা করতে চেয়েছিলেন। এবার, অঞ্জনদার ফর্ম অব ট্রিটমেন্টটা আমার ফর্ম অব ট্রিমেন্ট নয়। পুরোপুরি আলাদা। এটা আমার মনে হয়। আমাদের মধ্যে কোথাও হয়তো একটা অভিমান ছিলই। সেটা অস্বীকার করার জায়গা নেই। কিন্তু, সিনেমার জন্য আমরা আবার একে অপরের কাছে চলে এসেছি। আর, অঞ্জনদা কী অসামান্য অভিনয় করেছেন ব্যোমকেশে, তা ভাবা যায় না! তবে, একজন দর্শক হিসেবে আর মতামত দেওয়ার জায়গাটায় আমি আর নেই। রাস্তায় দাঁড়িয়ে ফুচকা খাওয়া বা পুজোর ভিড়ে মিশে যাওয়ার জায়গাটাতেও যেমন আমি আর নেই।

আপনি বললেন, দর্শকদের কথা ছবিটা বানানোর সময় মাথায় থাকে। মানে, দর্শক কীভাবে নেবেন। একজন শিল্পী যখন তাঁর শিল্পটুকু সৃষ্টি করছেন, সেই সময় দর্শকরা কীভাবে নেবেন, সেটা বোঝা বেশি জরুরি নাকি শিল্পী কী ভাবছেন এবং তিনি তাঁর মতো করে কতটা এগোতে পারবেন, সেটা ভাবা বেশি প্রয়োজন?

এটা ওভাবে করা যায় না। বলার সময় বলা যায়। বলতে ভালোলাগে। কিন্তু কোথাও গিয়ে মনের ভিতর ওই ব্যাপারটা চলতেই থাকে। আর সেটা করতে গিয়ে একটা প্র্যাক্টিক্যালিটির বাইরে বেরিয়ে আমি আমহার্স্টের কথা বলতে চাই। আমার সিনেমার মাধ্যমেই বলতে চাই সেটা। ওই কারণেই ‘ব্যোমকেশ গোত্র’ করতে গিয়ে ভাষা আন্দোলনের কথা বলেছি। বাহান্ন সালে বাতিস্তার ক্ষমতায় ফিরে আসার কথা বলেছি। কালিদাসও বলেছি। বাংলা ছবিতে কেউ এর আগে কখনও জয়দেব পড়তে পড়তে লাভমেকিং সিন শ্যুট করেনি। তা, সেটা যখন আমি দেখতে পাচ্ছি যে, দর্শক সমাদর করে গ্রহণ করছে, তখন খুব ভালোলাগে। আনন্দ পাই। আমি কোনও বাঁধাছকে বিশ্বাস করি না। অমুকটা দর্শকের ভালোলাগে বলেই আমি দর্শকদের দেব, সেইটা আমি করি না কখনও। আমি আসলে ইন্টারপ্রেট করতে ভালোবাসি। ছোটবেলা থেকেই আমি এটা করি। কোনও টেক্সট পড়লে সেটাকে নিয়ে নিজের ভিতর থেকেই ছানবিন করার তাগিদ অনুভব করতাম। এবং, তারপর সেই ছানবিনটা বা ভাংচুরটা নিজের মতো করে করতামও… আমি আসলে স্পষ্টভাবে জানি, আমার শক্তি কোনটা আর কোনটা আমার দুর্বলতা। এই ব্যাপারে আমি ওয়াকিবহাল। আমি জানি, আমি নিজে একটা গল্প লিখতে পারব না। আমি একটা কনসেপ্ট তৈরি করতে পারব। সেটা ডেভেলপ করতে পারব। তাই আমি অন্যদের সঙ্গে বসে লিখি। অন্যরা লেখে আমার জন্য। আমি সেটা সংশোধন করি। ডায়লগ বসাই, ইত্যাদি। আমি আমার দুর্বলতাটাকে স্বীকার করে কাজ করতে ভালোবাসি। সেটাকে ঢেকে আমি সত্যজিৎ রায় হওয়ার চেষ্টা করি না।

আপনার ছবির মধ্যে, বিশেষ করে শবরে, খুব সাটল একটা মরবিডিটি থাকে। মজার ব্যাপার, এটা বাঙালি গ্রহণ করে নিয়েছে…

খুব ইন্টারেস্টিং একটি কথা বলেছেন। আমি চেষ্টা করছি এমন একটি জঁর নিয়ে কাজ করার, যা বাংলা ছবিতে এর আগে কখনও হয়নি। এই মরবিডিটির কথাটা খুব ভালো বলেছেন। আমার ইনারিতু বা ওয়াংকর ওয়াইদের ছবি দেখতে ভালোলাগে। সেটাই হয়তো কোনওভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল।

শেষ প্রশ্ন, এই মুহূর্তে ভারতের একজন শিল্পী হিসেবে আপনি কেমন আছেন?

খুব খারাপ আছি। একজন ভারতীয় নাগরিক ও শিল্পী হিসেবে আমি খুব মাথা উঁচু করে বাঁচছি না। আমি ভীষণ চুপচাপ হয়ে গিয়েছি। যা করি, যা বলার চেষ্টা করি, তা নিজের কাজের মধ্যে দিয়েই বলার চেষ্টা করি।  আমরা কে কী খাচ্ছি, কী রঙের জামা পরছি…সত্যিই ভাবা যায় না!

বাংলা ছবিতে এই ব্যাপারগুলো আসছে না কেন?

সম্ভব নয়। এই ভারতবর্ষে কোনও প্রপার রাজনৈতিক ছবি তৈরি করা সম্ভব নয়। একজন জাফর পানাহি গৃহবন্দী হওয়ার পরেও ‘ট্যাক্সি’র মতো একটা ছবি বানাতে পারে, কিন্তু আমরা পারি না।

সেটা কেন?

তার কারণ, আমাদের সংস্কৃতিটাই সম্পূর্ণভাবে ও দুর্ভাগ্যজনকভাবে পলিটিসাইজড হয়ে গিয়েছে।

 

 

 

      

 


বাংলা ভাষায় বিশ্বের সকল বিনোদনের আপডেটস তথা বাংলা সিনেমার খবর, বলিউডের খবর, হলিউডের খবর, সিনেমা রিভিউস, টেলিভিশনের খবর আর গসিপ জানতে লাইক করুন আমাদের Facebook পেজ অথবা ফলো করুন Twitter আর সাবস্ক্রাইব করুন YouTube
Advertisement
Advertisement