হোমরিভিউস

Film Review Bramha Janen Gopon Kommoti: ব্রহ্মার আশীর্বাদে প্রতীক্ষার অবসান হবে ‘শবরী’দের?

  | March 07, 2020 11:03 IST (কলকাতা)
Window’s Production

শবরীর প্রতীক্ষার অবসান ঘটাবেন ঋতাভরী?

ঘণ্টা বেড়ালের গলায় এখনও ঠিকমতোবাঁধা না হলেও দু‘বছর ধরে নারী দিবসে মেয়েদের ঘিরে তৈরি হওয়া ট্যাবু ভাঙতে সমাজের চোখ খোলার দায়িত্ব নিয়েছে উইন্ডোজ প্রোডাকশন।

ছবি: ব্রহ্মা জানেন গোপন কম্মোটি

পরিচালক: অরিত্র মুখোপাধ্যায়

অভিনয়ে: ঋতাভরী চক্রবর্তী, সোমা চক্রবর্তী, মানসী সিনহা, শুভাশিস মুখোপাধ্যায়, সাহেব চট্টোপাধ্যায়, অম্বরীশ ভট্টাচার্য, সোহম মজুমদার

রেটিং: ৪.৫/৫


ট্যাগলাইন: ঘর থেকে হোক যাত্রা শুরু

‘বাবা, কন্যা মানে তো মেয়ে। আমাকেও তাহলে তুমি দান করে দেবে?'----মেয়েদের কি এই একটাই যন্ত্রণা? আরও আ-র-ও অনেক প্রশ্ন, যন্ত্রণার আজন্ম নিত্য আসা-যাওয়া। একে তো মেয়ে হয়ে জন্মানোই অভিশাপ। হ্যাঁ, একুশ শতকেও। তারপর চুলের ঝাপটা পুজোর উপকরণে লাগলে অশুদ্ধি, ঋতুস্রাব এবং নারীর সূচিতা, বিশেষ পেশায় অবাধ বিচরণে বাধা, মাঝরাতে প্রয়োজনে কিংবা নিতান্ত অপ্রয়োজনেই রাস্তায় নির্ভয়ে হাঁটতে না পারা, ধর্ষণের পর তিলে তিলে যন্ত্রণা-অপমানে বিদ্ধ হয়ে মৃত্যু হলেও ধর্ষকদের শাস্তিদানে ঢিলেমি----এসবই তো প্রতি মুহূর্তে নারীকে কুরে কুরে খায়! সারা বছর ধরেই এই প্রশ্ন চর্চিত হয় নানা আলোচনায়। বছরের একটি দিন অর্থাৎ নারী দিবসে আরও ঘটা করে। কিন্তু সমাধান হয় কই! বেড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে?

ঘণ্টা বেড়ালের গলায় এখনও ঠিকমতো বাঁধা না হলেও দু‘বছর ধরে নারী দিবসে মেয়েদের ঘিরে তৈরি হওয়া ট্যাবু ভাঙতে সমাজের চোখ খোলার দায়িত্ব নিয়েছে উইন্ডোজ প্রোডাকশন। বকলমে পরিচালক নন্দিতা রায়, শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। গেল বারে ‘মুখার্জিদার বউ' দেখিয়েছে, শাশুড়ি-বউমা খুব ভালো বন্ধু হতে পারে। এবছরের নিবেদন, ঋতুস্রাব নিয়ে অযথা কুসংস্কার, বিয়েতে কন্যাদানের মতো লজ্জাজনক আচার, পুরোহিত পেশায় মেয়েদের অমর্যাদার মতো বৃহত্তর বিষয় নিয়ে বড়পর্দায় বড় করে আন্দোলন। 'ব্রহ্মা জানেন গোপন কম্মোটি' ছবি দিয়ে।

ছবির মুখ্য চরিত্র শবরী গঙ্গোপাধ্যায় ছোট্টবেলায় বাবার দেখে দেখে শিখেছে পুজোর কাজ। বাবা পরে তাকে হাতে ধরেও শিখিয়েছেন। মেয়ের 'আইকন' বাবা এটাও শিখিয়েছিলেন, সব কিছু শেখো জানো। কিন্তু শুধুই ভালোটা নাও। কন্যাদানের মন্ত্র কোনও বিয়েতে উচ্চারণ কর না। কারণ, মেয়েরা দানসামগ্রী নয়। যে, কটা মন্ত্র উচ্চারণ করে তাকে দান করে দেওয়া যাবে। বাবার আকস্মিক মৃত্যুর পর তাঁর পেশা-ই শবরীর পেশা। সমাজের অনেক ঝাপটা পুইয়ে সে মহিলা পুরোহিত। পাশাপাশি, সংস্কৃতের অধ্যাপিকা। তার গড়া মহিলা বাহিনি মঞ্চে মেয়েদের ওপর অত্যাচারের কথা বলে। ঋতুস্রাব নিয়ে অযথা কুসংস্কারের বিরোধিতা করে। এবং তাই দেখেই শবরীকে মনে ধরে বাতাসিপুরের মহিলা গ্রামপঞ্চায়েতের ছোট ছেলে বিক্রমাদিত্য চক্রবর্তীর।

কুষ্ঠি মিলিয়ে রাজযোটক এই বিয়ে নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হলেও গোল বাঁধে শ্বশুরবাড়িতে পা রাখামাত্র। শবরীর তো কন্যাদান-ই হয়নি! এই বিয়েকে তাহলে আদৌ বিয়ে বলা যাবে কী? মত শাশুড়ির। এরপরেই শুরু শবরীর আসল সংগ্রাম। গোঁড়া শ্বশুরবাড়ির একাধিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে। গ্রামের চরিত্রহীন পুরোহিতের বিরুদ্ধে। এবং শেষে নারীর জয়, নারীত্বের জয়। এই সংগ্রামে শবরী পাশে পেয়েছে শ্বশুর, ভাসুর, স্বামীকে। তাঁদের উপস্থিতি পর্দায় নিতান্ত খড়কুঠো মনে হলেও নারীর সমর্থনে পুরুষের এই এগিয়ে আসা, ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বইকি!

এটি ছবির গল্প। রইল বাকি ছবি নিয়ে আলোচনা। নন্দিতা রায়-শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের নিবেদন মানেই টানটান চিত্রনাট্য, উইটি সংলাপ আর কান পেতে শোনার মতো গান। শেষে ইতিবাচক মন নিয়ে ঘরে ফেরা আর নতুন নতুন অভিনেতা-পরিচালক আবিষ্কার। জিনিয়া সেনের এই গল্প গত সরস্বতী পুজোর সময় প্রকাশ্যে এসেছিল। পরে তিনি চিত্রনাট্য লেখেন। তাই কি ছবির শুরু সরস্বতী বন্দনা দিয়ে? ঋতাভরী চক্রবর্তী ওরফে শবরী এই ছবির প্রাণ ভোমরা। ঋতাভরী নিজেও নারী স্বাধীনতায় পূর্ণ বিশ্বাসী। তাই অভিনয়ের প্রতি মুহূর্তে কোথাও উচ্চগ্রামের অভিনয় না করেও স্পষ্ট করে প্রশ্ন তুলেছেন, 'নারীকে আপন ভাগ্য জয় করিবার কেন নাহি দিবে অধিকার?' সাজে-অভিনয়ে তিনি ভয়ানক সুন্দর। তাঁর যোগ্য সঙ্গতকার 'কবীর সিং' খ্যাত অভিনেতা সোহম মজুমদার। ইষৎ টেনে বলা সংলাপ যেন তাঁরই নমনীয় কিন্তু দৃঢ়চেতা মনকে তুলে ধরতে সাহায্য করেছে। এঁদের জুটি বেশ ভালো। বাকি, সোমা চক্রবর্তী, মানসী নাথ, অম্বরীশ ভট্টাচার্য, সাহেব চট্টোপাধ্যায় এবং শুভাশিস মুখোপাধ্যায়। প্রত্যেকে পারফেক্ট তাঁদের চরিত্রে। বিশেষ করে বউমাকে সমর্থন জানিয়ে শাশুড়ির নেত্রীসুলভ ঘোষণা যেন 'চ্যারিটি বিগন অ্যাট হোম'-এরই নয়া সংস্করণ। বাড়তি চমক, পর্দায় ইমন চক্রবর্তীর ঝলক। পরের বার বড় চরিত্রে ইমনের দেখা পাবে তো দর্শক?

ছবির গান মুক্তির আগেই হিট। ইদানিং বাংলা ছবির গান ফের কানে-মনে দোলা দিচ্ছে। 'কোন গোপনে মন পুড়েছে' বা শবরীর যাত্রাপথের গান---- ইউ টিউবে লাখ লাখ ভিউয়ার্স পেয়েছে। সুরঙ্গনাকে একবারও মনে হয়নি এই ছবিতে তাঁর প্রথম প্লেব্যাক! যাঁর ছোঁয়ায় ঋতাভরী ঠিকঠাক 'শবরী' বাস্তবের সেই মহিলা পুরোহিত এবং সংস্কৃত কলেজের অধ্যাপিকা নন্দিনী ভৌমিকের তত্ত্বাবধান তো আছেই। আরও একটা জিনিস ভালো লেগেছে--- জিনিয়া সেন, সম্রাজ্ঞী বন্দ্যোপাধ্যায় (সংলাপ)-এর পাশাপাশি ছবিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সমান উদযোগী দুই পুরুষ। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়ে গেছেন পরিচালক অরিত্র মুখোপাধ্যায় এবং সুরকার অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়। যত্ন নিয়ে তাঁদের দায়িত্ব পালন করে। অরিত্র প্রথম ছবিতেই বাউন্ডারির বাইরে বল পাঠিয়ে দিয়েছেন। ফলে, তাঁকে ঘিরে আশা বাড়ল দর্শকের।

এক সপ্তাহ আগে মুক্তি পাওয়া হিন্দি ছবি 'থাপ্পড়' দেখিয়েছে, মানসিক এবং দৈহিক আঘাত নারী-পুরুষ কারোরই কাম্য নয়। একই ভাবে 'ব্রহ্মা জানেন গোপন কম্মোটি' চপেটাঘাত করল সমাজের গালে, যেখানে এখনও নারী-পুরুষের তুল্যমূল্য বিচার হয়। একটি ছবির নেপথ্যে নারী-পুরুষকে একসঙ্গে কাজের দায়িত্ব দিয়ে।

শুভাশিস মুখোপাধ্যায়ের অভিনয় দেখতে দেখতে এই প্রতিবেদকের বারেবারে মনে পড়ছিল কলকাতার এক রাজবাড়ির রাজ পুরোহিতের কথা। যাঁর নামের পেছনের লম্বা ডিগ্রির তালিকা না দিয়ে শুধুই 'রাজ পুরোহিত' বলে উল্লেখ করায় তিনিও এই প্রতিবেদককে মুঠোফোনে অভিনেতার মতো করেই 'মূর্খ' উপাধি দিয়েছিলেন!







বাংলা ভাষায় বিশ্বের সকল বিনোদনের আপডেটস তথা বাংলা সিনেমার খবর, বলিউডের খবর, হলিউডের খবর, সিনেমা রিভিউস, টেলিভিশনের খবর আর গসিপ জানতে লাইক করুন আমাদের Facebook পেজ অথবা ফলো করুন Twitter আর সাবস্ক্রাইব করুন YouTube
Advertisement
Advertisement
Listen to the latest songs, only on JioSaavn.com