হোমরিভিউস

 Review: অস্থির সময়, নষ্টনীড়...ঘরে-বাইরে....আজও

  | November 17, 2019 18:22 IST (কলকাতা)
Aparna Sen

ঘরে বাইরে....আজ

এভাবেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং সত্যজিৎ রায়কে অনুসরণ না করে, শুধু তাঁদের কাজের থেকে সামান্য গন্ধ মেখে একুশের অপর্ণা সেনের প্রতিবাদ ‘ঘরে বাইরে আজ’।

ছবি: ঘরে বাইরে আজ

পরিচালকঅপর্ণা সেন

অভিনয়: যীশু সেনগুপ্ত, তুহিনা দাস, অনির্বাণ ভট্টাচার্য, বরুণ চন্দ, সোহাগ সেন, শ্রীনন্দা শংকর, ঋতব্রত মুখোপাধ্যায়

প্রযোজনাশ্রী ভেঙ্কটেশ ফিল্মস


রেটিং : ৪.৫/৫

বিধির বাঁধন কাটবে তুমি...

রবি ঠাকুরের আমলের নিখিলেশ-বিমলা-সন্দীপ স্বাধীনোত্তর ভারতের একুশ শতকের প্রতিনিধি হলে কী দেখত? ব্রিটিশ শাসকের জায়গা নিয়েছে স্বাধীন দেশের রাজনৈতিক দল। যাঁদের শাসনে-তাশনে নাভিশ্বাস ওঠার জোগাড় দেশের। দেশের মানুষদের। 'পরধর্মসহিষ্ণু দেশ' বলে বিশ্বের দরবারে যার সবসময়েই আদর-কদর ছিল, সে দেশ সারাক্ষণ ফুটছে ধর্মান্ধতায়। গো-রক্ষণ, জাতের নামে বজ্জাতিতে। কী করত তখন কবিগুরুর এই তিন অমর সৃষ্টি? স্বাভাবিক ভাবেই নিখিলেশ গণতন্ত্রের পক্ষ নিত। সন্দীপ অবশ্যই তর্কে-বিতর্কে তাকে রক্তাক্ত করে সদম্ভে সাপোর্ট করত ‘জয় শ্রীরাম' জিগিরকে। আর বিমলা? শিক্ষিতমনস্ক হয়েও বেচারি তখনও ‘শ্যাম রাখি না কূল'...দ্বন্দ্বে ভুগত।

এই আধুনিক ভাবনা নিয়েই অপর্ণা সেনের নতুন ছবি ‘ঘরে বাইরে...আজ'। যা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, যা ছিল মহাভারতে তাই-ই আছে আজকের ভারতে। অপর্ণার নিখিলেশ বনেদি-শিক্ষিত বংশের ছেলে। পেশায় সাংবাদিক। স্বপ্ন দেখে ধর্ম-ভেদহীন এক দেশের। যেখানে 'সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই'। স্ত্রী বৃন্দা বিহারে থাকার সময় দলিত বিমলা। কনভেন্ট শিক্ষিতা হওয়ার সময় বৃন্দা। অক্সফোর্ডের প্রুফ রিডার। নিখিলেশের ঘরনি। কিন্তু ঘরে বাইরে পা রাখেনি। সন্দীপ ঝা নিখিলেশের স্কুল-কলেজের বন্ধু। মার্কস, মাওবাদী হয়ে বর্তমানে শাসক দলের সেনাপতি।

২০ বছর পরে...

সন্দীপ-নিখিলেশ মুখোমুখি। আবার। নিখিলেশ খুশি, ছেলেবেলার বন্ধু তার বাড়িতে উঠবে। বউকে ঠাট্টা করে বলেওছে, সন্দীপকে দেখলেই একসময় মেয়েরা চোখ-কান বুঁজে প্রেমে পড়ত! বন্ধু আসতেই তাই খুশির বন্যা। সন্দীপ-নিখিলেশের পুরনো স্মৃতি-রোমন্থন। পুরনো কলেজ, জায়গা ঘুরে দেখা।

ঠাস ঠাস প্রেমে পড়া....

আগে বলা সত্ত্বেও সন্দীপকে দেখে এভাবেই অন্য মেয়েদের মতো প্রেমে ভাসে বৃন্দাও। নিখিলেশ অনেক শান্ত। সে যুক্তি দিয়ে নীচু স্বরে কথা বলে। জোর ফলাতে পারে না। কিন্তু সন্দীপ পারে। যুক্তির জাল বিছিয়ে মন কাড়তে। জোর করতে। দাবি জানাতে। মেয়েরা একজন পুরুষের থেকে যা যা চেয়ে থাকে। ফলে, শুরু দাম্পত্য টানাপোড়েন। হাসপাতাল গড়ে তোলার অজুহাতে মাসের পর মাস নিখিলেশের বাইরে কাটানো। তবু নিজের স্ত্রীকে জোর গলায় বলতে পারে না, সন্দীপের নয়, তুমি শুধু আমার-ই! যদিও শ্যামকে ছুঁতে যাওয়ার আগে বৃন্দা ভীরু গলায় একবার সন্দীপকে বলেছিল বটে, 'আমাকে বাড়ি ফিরতে হবে'। কিন্তু সন্দীপের দু-কুল ছাপানো প্রেমের কাছে সে তো বালির বাঁধ! সেযুগের 'মক্ষিরানি' বিমলা তাই এযুগের সন্দীপের Bee. 

একুশের অপর্ণা

এভাবেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং সত্যজিৎ রায়ের ছোঁয়া বাঁচিয়ে, শুধু তাঁদের কাজের সামান্য গন্ধ মেখে একুশের অপর্ণা সেনের প্রতিবাদ ‘ঘরে বাইরে আজ'। পরিচালকের প্রতিবাদ এই জন্যেই, তিনি রোজ যা দেখছেন, প্রয়োজনে পথে নেমে যা বলছেন এবং করছেন---সেটাই ছবিতে উঠে এসেছে হুবহু। তাই 'ঘরে বাইরে আজ' পরিচালকের রাজনৈতিকমনস্কতার দলিল। এবং সমাজ সচেতনতার জ্বলন্ত বার্তা। আজকের রাজনৈতিক অস্থিরতাকে তুলে ধরতে গেলে এই তিন চরিত্রের ডাক পড়াও তাই স্বাভাবিক।

বাকি অভিনয়। যীশু-অনির্বাণ সুযোগ পেলেই 'বাপি বাড়ি যা' ব্যাটিং করেন, দর্শক জানেন। কিন্তু তুহিনা বৃন্দার ভূমিকায় কোথাও ফাঁক রাখেননি। ব্যাকরণ মেনে সুন্দরী না হয়েও তাঁর ইনটেলেকচুয়াল সৌন্দর্য পুরুষ বশের অমোঘ তির। এর আগে এবং পরে যীশু অনেক ছবিতে অভিনয় করেছেন, করবেনও। কিন্তু যীশুর এই পুরুষালি দাপট-সৌন্দর্য অপর্ণার আগে কেউ ব্যবহার করে দেখাতে পারেননি। পর্দার যীশুকে দেখলে সত্যিই হলের আবালবৃদ্ধবনিতা মহিলা দর্শক তাই 'ঠাস ঠাস প্রেম'-এ পড়বেন। পাশাপাশি, এই ট্রায়ো একবারও সৌমিত্র-স্বাতীলেখা-ভিক্টর বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুষঙ্গ মনে পড়ায় না। এটা অভিনেতা এবং পরিচালকের কৃতিত্ব।

বৃন্দা-সন্দীপের প্রেম, আশ্লেষে ভেজার দৃশ্য যত্ন নিয়ে দেখিয়েছেন পরিচালক। শ্রীনন্দা ভীষণ স্বাভাবিক ভাবে সঙ্গত করেছেন নিখিলেশকে। বৃন্দার সাজ, বিশেষ করে দক্ষিণ ভারতীয় চওড়া লালপেড়ে শাড়ির সঙ্গে রুপো-জাঙ্ক জুয়েলারির গয়না, ঝাঁকড়া চুলের অবাধ্যতাকে স্বাধীনতা দিয়ে চরিত্রকে আরও অভিজাত করেছেন সাবর্ণী দাস। নীল দত্তের শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ঘেঁষা ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর এবং গান---কানকে আরাম দেয়। এবং অবশ্যই ‘অমূল্য দত্ত' ঋতব্রত মুখোপাধ্যায় এই ছবির অমূল্য সম্পদ। তারুণ্য-যৌবনের সন্ধিক্ষণে দাঁড়ানো ঋতব্রত অভিনয়ে সারল্যের সঙ্গে বুদ্ধিমত্তার মিশেল ঘটিয়ে আরও একবার প্রমাণ করলেন, তিনি থাকবেন। ছবিতে মুসলিম বন্ধুর রাজনৈতিক হত্যা অমূল্যের টনক নড়িয়েছে। বাস্তবে দেশের ঘুম ভাঙবে কবে?  







বাংলা ভাষায় বিশ্বের সকল বিনোদনের আপডেটস তথা বাংলা সিনেমার খবর, বলিউডের খবর, হলিউডের খবর, সিনেমা রিভিউস, টেলিভিশনের খবর আর গসিপ জানতে লাইক করুন আমাদের Facebook পেজ অথবা ফলো করুন Twitter আর সাবস্ক্রাইব করুন YouTube
Advertisement
Advertisement