হোমআঞ্চলিক

"আয়ুব বাচ্চুর মৃত্যুতে হারালাম নিজের বড় দাদাকে": রূপম ইসলাম

  | October 21, 2018 17:09 IST
Ayub Bachchu

প্রয়াত হলেন বিখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী আয়ুব বাচ্চু। তাঁকে নিয়ে একটি অন্তরঙ্গ স্মৃতিচারণে NDTV Bangla'র মুখোমুখি রূপম ইসলাম। শুনলেন বোধিসত্ত্ব ভট্টাচার্য।

উৎসবের সঙ্গে অন্তহীন অন্তরঙ্গতায় তিনদিন আগের  শহর তখন জড়িয়ে ফেলেছিল নিজের শরীর। শহরের যান চলাচল, একটি হাত ধরে অনেকটা হাঁটা, একা নৌকার যাত্রীর মতো বিড়বিড় করতে করতে জলের দিকে তাকানো- সব দৃশ্যই উপস্থিত ছিল তাতে। এমন সময়ই খবরটা এলো। রক সঙ্গীতের অনন্ত আকাশে আলোর অপেরা মঞ্চস্থ করে চলেছিলেন যিনি দশকের পর দশক ধরে, সেই আয়ুব বাচ্চু আর নেই। উৎসবের শহরে বড় তাড়াতাড়ি নেমে এসেছিল সন্ধে সেদিন। বড় তাড়াতাড়ি নেমে এসেছিল অগ্রহায়ণ বা পৌষের কোনও আঁধার হিমের রাত। কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরে বিদেশের এক শহরের রাতে বসেই অত্যন্ত শোকস্তব্ধ অবস্থায় তাঁকে স্মরণ করলেন রক সঙ্গীতের নক্ষত্রপথটিতে তাঁর  সহ-পথিক রূপম ইসলাম। তাঁর 'বাচ্চু ভাই'-এর মৃত্যুদৃশ্যটিকে সঙ্গে নিয়ে একাকী কোনও মহাস্তব্ধ বন্দরে দাঁড়িয়ে কুয়াশা বাঁশিই বাজালেন যেন। যার সুরটি শুনতে শুনতে মনে হয়, হৃদযন্ত্রটি থেমে গেলেও কোথাও হৃদয় থেকে যায় তবু... মন বলে, ওই আমাদের গিটার... সাক্ষী রইলেন বোধিসত্ত্ব ভট্টাচার্য

গিটারটি অসামান্য বাজাতেন তিনি। আসলে তার সঙ্গে তাঁর ছিল যেন আলোর সিঁড়ি ধরে হাত ধরে নেমে আসা সখ্য। তাঁর গিটারটিকে যদি আজ কিছু বলতে হয়, তবে, রূপম ইসলাম কী বলবেন?

এই মুহূর্তে আমি অত্যন্ত শোকস্তব্ধ। আয়ুব বাচ্চুর গিটারকে উদ্দেশ্য করে হয়তো আমি কিছুই বলব না। শুধু স্মরণ করব কিছু সোনালি মুহূর্ত।  আমি ছিলাম এই মানুষটির বিশেষ স্নেহধন্য। তিনি বারবার আমাকে স্মরণ করেছেন, ডেকে পাঠিয়েছেন এক অনন্য অধিকারে। এই একই অধিকারে আমাদের কনসার্টের মধ্যেও মঞ্চে উঠে এসেছিলেন তিনি একটিবার। তারপর 'বাইসাইকেল চোর'-এ তাঁর সঙ্গত, 'বিষাক্ত মানুষ' গানে তাঁর সঙ্গত... মনে পড়ছে পুরোটাই। আমার অনুষ্ঠানের শৈশব থেকেই তাঁর গান আমি গেয়ে আসছি মঞ্চে। একটা সময় এমনও ব্যাপার ছিল, এখানকার বহু শ্রোতা, যাঁরা 'সেই তুমি' তখনও শোনেননি, তাঁরা আমার মাধ্যমে প্রথম শোনেন গানটি। শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে আমি বাংলাদেশের গানবাজনা নিয়ে কলাম লিখতাম। সেখানে বারবার উঠে আসত আয়ুব বাচ্চুর কথা। উঠে আসত সমসাময়িক আরও অনেকের কথাও। কিন্তু সেখানে আয়ুব বাচ্চু এবং এলআরবি সবসময়ই একটি বিশেষ স্থান অধিকার করে ছিল। তাঁর অ্যালবামগুলোতে অদ্ভুত চমকপ্রদ কিছু এক্সমেরিমেন্ট ছিল, যা মন কেড়ে নিয়েছিল আমার। সেই যুগের বিচারে প্রোডাকশন কোয়ালিটিও ছিল অনবদ্য। বিশেষ একটি অ্যালবামের কথা আমি বলব এই প্রসঙ্গে,  তার নাম- 'আমাদের বিস্ময়'। 'আমাদের' একটা অ্যালবাম, 'বিস্ময়' একটা অ্যালবাম। ডবল অ্যালবাম। এমনভাবে যে একটি অ্যালবামের নামকরণ করা যেতে পারে... মনকে অন্যভাবে নাড়া দিয়ে গিয়েছিল। গানের বিষয় নির্বাচনেও ওই অ্যালবামটি ছিল অনন্য। উনি আমাকে একটি অ্যালবাম উপহার দিয়েছিলেন ওঁর। সেটার নাম- 'মন চাইলে মন পাবে'। সেই অ্যালবামটির মধ্যে একটি চিরকুটে তিনি আমাকে ওঁর নম্বর লিখে দিয়েছিলেন। এটা  সেই যুগের কথা, যখন মোবাইল অতি-ব্যবহৃত বস্তু হয়ে পড়েনি। তখন নম্বরগুলো মানুষ মানুষকে লিখে দিত। উনি লিখে দিয়েছিলেন নিজের হাতে। যখনই কলকাতায় আসতেন, উনি ডেকে পাঠাতেন। শেষবার উনি যখন কলকাতায় আসেন, আমার বাড়িতেও এসেছিলেন। ওই সময় আবার ওঁর গিটারের সঙ্গে আমি সঙ্গত করার সুযোগ পাই। 'চাঁদনীতে উন্মাদ' বাজিয়েছিলেন তিনি...এক শান্ত নদীর কথা ভাবো

যে চাইছে তোমার চুম্বন,


এক তপস্যার কথা ভাবো

যে চাইছে গহন তপবন...আরও কয়েকটি গানও বাজিয়েছিলেন উনি। আমিও সেদিন বাজিয়েছিলাম ওঁর কয়েকটি গান। একসঙ্গে গেয়েও ছিলাম সেদিন আমরা দুজনে। এই সুযোগ বোধহয় খুব বেশি মানুষের হয়না। এর ঠিক কিছুদিন আগে কলকাতায় উনি একটি সম্মান পেয়েছিলেন। যা আমি তাঁর হাতে তুলে দিই। নজরুল মঞ্চে স্টেজে দাঁড়িয়ে উনি বলেন, রূপমকে গাইতে হবে। আমি বাজাব। উনি গিটারটা প্লাগ-ইন করলেন...পুরোটাই কিন্তু অনুশীলন ছাড়া...উনি বাজাতে আরম্ভ করলেন, আমাকে গাইতে হল- সেই তুমি...সেই তুমি কেন এত অচেনা হলে...এই বঙ্গে এই গানটি অসম্ভব জনপ্রিয়। বাংলাদেশে খুব জনপ্রিয় তাঁর 'রূপালি গিটার' গানটি...'এই রূপালি গিটার ফেলে একদিন চলে যাব দূরে, বহুদূরে, সেদিন চোখে অশ্রু তুমি রেখো গোপন করে'...সেদিন সত্যিই এলো...কেউ অশ্রুগোপন করে রাখছেন, কারও বা চোখ সজল।

আয়ুব বাচ্চুর গানের মধ্য দিয়ে জীবনের আনোখা ঝলকানিটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বেরিয়ে আসে। গানের সুর, কথা, গায়কী এবং উপস্থাপনা - সবই যার অংশ। এই একই জিনিস দেখা যায় আপনার ক্ষেত্রেও।  কখনও মনে হয়েছে, অমুক জায়গাটা আমি যদি ওঁর থেকে আরও ভালো করতে পারতাম?

এই প্রশ্নটির উত্তর দেওয়ার আগে আমি আরেকটি অ্যালবামের কথা স্মরণ করতে চাইছি। সেটাও আরেকটি ইউনিক অ্যালবাম।   এলআরবি আনপ্লাগড অ্যালবাম। লাইভ রেকর্ডিং হয়েছিল। ফেরারী মন। সেখানে ডিসটর্শন গিটারের শব্দবাহুল্য ছিল না। অ্যাকোস্টিক গিটার ছিল। আর ছিল একটি বেহালা। যতদূর মনে পড়ে, বেহালা বাজিয়েছিলেন বাংলাদেশের বিখ্যাত যন্ত্রী সুনীল দাস। এছাড়া এলআরবি ছিল। সেদিন আমার বাড়িতে উনি যখন এসেছিলেন, আমরা ওই অ্যালবামের একটি গান গেয়েছিলাম একসঙ্গে। 'এখন অনেক রাত'...এখন অনেক রাত, খোলা আকাশের নিচে, জীবনের অনেক আয়োজন, তাই আমি বসে আছি,দরজার ওপাশে'...যেটা বলার, তা হল, শুধু গিটার বাদনই নয়, তাঁর কণ্ঠস্বর এবং তাঁর গায়কী, এই দুটিতেই ছিল একটি ভরাট ব্যাপার...তিনি আমার খুব প্রিয় গায়ক। আমিও ছিলাম ওঁর খুব প্রিয় গায়ক... আমার প্রথম অ্যালবাম যখন বেরোয়... 'তোর ভরসাতে'...সেই অ্যালবাম থেকে একটি গান 'নীল রঙ ছিল ভীষণ প্রিয়' কিন্তু বাংলাদেশে আগে জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। বাংলাদেশের একটি বিশিষ্ট চ্যানেলের একটি নাটকে এই গানটি ব্যবহৃত হয়। ওই নাটকে আয়ুব বাচ্চুর একটি গান ছিল। এবং, আরেকজন শিল্পীর আরেকটি গান ছিল। পরিচালনা করেছিল রিঙ্গো। আয়ুব বাচ্চু ওই সময় থেকেই আমার গান এবং আমার গায়কী পছন্দ করতে আরম্ভ করেন।  তিনি আমার প্রেজেন্টেশন বারবার দেখেছেন। আমার তৈরি হওয়ার সময় দেখেছেন। আমি যখন প্রবল জনপ্রিয়তা পেয়েছি, তখনও দেখেছেন। এবং, বারবার বলেছেন, এভাবেই আসবে বাংলায় রক। এই প্রেজেন্টেশনটাই চাই। এর মাধ্যমেই তুই আনতে পারবি বাংলায় রক। বলেছিলেন তিনি। ওঁর একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম আমি। সেই সাক্ষাৎকারের অনেক জায়গা ছাপানো যায়নি, কারণ, এত মুক্তকন্ঠে তিনি আমার প্রশংসা করছিলেন সেখানে, তা ম্যাগাজিনের সম্পাদক হিসেবে আমার পক্ষে প্রকাশ করাটা বিড়ম্বনার। আমি যেমন খুব স্বাভাবিক কারণে ওঁর মুগ্ধ শ্রোতা, উনিও তেমন ছিলেন আমার গানের এবং আমার উপস্থাপনার এক মুগ্ধ শ্রোতা ও দর্শক। আমার কাজ নিয়ে খোঁজখবর রাখতেন এবং পছন্দ করতেন। আমি স্মরণ করতে চাই আরও একটি ঘটনা। ফসিলসের প্রথম অ্যালবামের প্রথম যে গানটি, 'আরো একবার', তা আমি খানিকটা ওঁর গায়কীর কথা মাথায় রেখেই সুর করেছিলাম। আমার মনে হয়েছিল, এই গানটা যদি আয়ুব বাচ্চু গাইতেন, খুব ভালো হত। অন্যদিকে, 'সেই তুমি' আমি এতবার এত মঞ্চে গেয়েছি...আমি একবার ওঁকে বলেছিলাম- বাচ্চু ভাই, এই গানটা কিন্তু আমার গান। এই গানটা আমি যেভাবে গাই, তাতে আমি অন্য একটা কিছু যোগ করতে পারি। যতবার গেয়েছি গানটা, মনে হয়েছি ওই একটিই কথা, এটা আমারই গান। উনি আমাদের আগের প্রজন্মের সেই প্রতিনিধি, যাঁর কাজ দেখে ও শুনে আমরা অনুপ্রাণিত হয়েছি। মনে হয়েছে এত অ্যাগ্রেসিভ, প্যাশনেট, পাওয়ারফুল রক মিউজিক যদি বাংলাদেশে হতে পারে, তবে পশ্চিমবঙ্গে কেন হবে না? তাঁর সান্নিধ্যে বারবার এসেছি। আমাকে বরাবর গাইড করেছেন, দরকারে সমালোচনা করেছেন, আমাকে নিজের পরিবারের অংশ হিসেবে জায়গা দিয়েছেন। এই সবকিছুর পিছনে আমার যোগ্যতা কতটুকু ছিল? আমার পক্ষে তা বিচার করা মুশকিল। আমি বরং এইভাবে ভাবব,  আমার কোনও যোগ্যতা ছিলই না। আমি ভাবব যে, গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের পরে এতটা স্নেহ আমাকে হয়তো খুব কম মানুষই দিয়েছেন। আরও কেউ কেউ দিয়েছেন, কিন্তু সংখ্যাটা হাতেগোনা। আয়ুব বাচ্চুর কাছ থেকে আমার প্রাপ্তি যেটা, ওঁর স্নেহ ও আশীর্বাদ। পরামর্শ এবং নির্দেশ। আমার অন্য কিছুই এই শোকের মুহূর্তে এই জায়গাটার থেকে বড় বলে মনে হচ্ছে না। আমি যদি সবথেকে বেশি কিছু মিস করে থাকি আজকে, তা হল, আমি আমার পরিবারের একজন বড় দাদাকে হারালাম।

আমি বুঝতে পারছি আপনার মনের অবস্থাটা। তাই একটু বিব্রতও বোধ করছি। চাইছি না মৃত্যু নিয়ে কথা বলতে।

বিব্রত হোয়ো না। প্রশ্ন করো।

উনি আপনাকে নিজের ভাইয়ের মতো স্নেহ করতেন। শুধু স্নেহই করতেন না, আপনি যে এপার বাংলায় রকসঙ্গীতকে একটি বাগান তৈরি করার মতো বুঁদ হয়ে বানাবেন, তাও তিনি বলেছিলেন অনেক আগে...

এই প্রশ্নের উত্তরে বলি, যেভাবে তুমি কথাটা বললে, তা খুব ফরম্যাল শোনাচ্ছে। আমাদের সম্পর্কটা খুব স্বাভাবিকভাবে তৈরি হয়েছিল। অনুষ্ঠান করে এসে উনি নিজের গেস্ট হাউজের সামনের ফুটপাতের রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমি ওঁর সঙ্গে গিয়ে কথা বলি। আলাপ করি। কী ধরনের গান আমি করি, তা ওঁকে জানাই। উনি আমাকে ওঁর গেস্ট হাউজের ভিতরে নিয়ে গেলেন। আমি দুটি কথা বলব এই প্রসঙ্গে। ওভার কনফিডেন্স নয়, তবে কনফিডেন্স আমার ছিল। একটা প্রত্যয় ছিল। কী করতে চলেছি, তা নিয়ে। বোধের দিক থেকে বোধহয় একটা পরিণত মানসিকতা ছিল, যা বোঝা যেত। আর দ্বিতীয়টি হল, সারল্য ছিল। বেড়েপাকা ছিলাম না আমি। নেওয়ার ক্ষমতা ছিল। ছিল কনসেনট্রেট করার ক্ষমতা। আর ছিল, প্রশ্ন করার ক্ষমতা।  কাউকে দিয়ে কিছু বলিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা। সেই জায়গায় তাঁকে উদ্বুদ্ধ করার ক্ষমতা, যাতে তিনি কিছু বলেন। হয়তো এটুকুই ছিল আমার, যার জেরে, আমি এলআরবির অন্দরমহলে প্রবেশাধিকার পেয়েছিলাম। ঢুকে গেল একেবারে নবীন এক শিল্পী। সেখানে তাঁরা অন্দরমহলের পোশাকে একদম ঘরোয়া সাজে রুটি-মাংস খাচ্ছেন, অমন একটি মুহূর্তে আমি তাঁদের অংশ হয়ে যাচ্ছিলাম ক্রমশ। ওই সময় আমার কাছে আমার গিটারটি ছিল। আর ছিল আমার গান। সেই গান শুনে ওই দিনেই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, এই গান কোন পথ ধরে এগোবে। আজকে বাংলা রক মিউজিককে চিনি যে বৈশিষ্ট্যগুলির মাধ্যমে, সেখানে কিন্তু 'প্রত্যয়' শব্দটা রয়েছে। রয়েছে 'সারল্য' শব্দটাও। যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অভিজ্ঞতা। আসলে রক মিউজিকের যে প্যাশন, তা আসে নতুনের আবাহন ও উদ্দীপনা থেকে। নতুনের তৈরি হওয়ার যে তাড়না, তা আয়ুব বাচ্চুর মতো গুণী শিল্পীরা বা জহুরিরা তা বুঝতে পারেন। মেনে নিতে পারেন। আপনি বললেন 'বাগান সাজানোর কথা', আমি বলি, উনি আমার মধ্যে সম্ভবত দেখেছিলেন, বাংলা গানের এক শ্রমিককে। যে চেষ্টা করছিল বাংলা রক গান নিয়ে নিজের মতো কিছু করার। যার পিছনে বিরাট কোনও নিশ্চয়তা নেই। যার কোনও ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স ছিল না। কেবল ওই প্রত্যয়টা ছিল। আর ছিল লড়াই করার ইচ্ছেটা। তা ওঁর নজর এড়ায়নি কোনওভাবেই। উনি মনে মনে আমার ওই লড়াইটার অংশ হয়ে পড়েছিলেন। যা আমি অনুভব করেছিলাম। তিনি কিন্তু তা মনে রেখেছিলেন। তিনি আমাকে নিয়ে গর্ববোধ করতেন। অসম্ভব গর্ববোধ করতেন ওই কারণেই। স্বাভাবিক সৌজন্যের খাতিরে আমি মাঝেমাঝে আলোচনাটা ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতাম। উনি কিন্তু ফের ফিরে আসতেন ওখানেই। আর সহজাত ভঙ্গিতে আমার কথা বলতে গিয়ে বলতেন, 'দেখেছিস তো! আমি কিন্তু বলেছিলাম'! আমার একরোখা লড়াইয়ের জায়গাটা ওঁর চোখে বেশি পড়েছিল।  আর নিজের লড়াইটাকে নিজের গানের মধ্যে মিশিয়ে দেওয়ার যে সহজাত প্রবণতা আমার ছিল, তা শুনে মুগ্ধ হয়েই উনি কিন্তু আমার বহু গানের ক্ষেত্রে এই কথাটি বলেছিলেন যে, তোর গলা ছাড়া অমুক গানটা জনপ্রিয় হতো না। তিনি বুঝতে পারতেন, ঠিক কোন তাড়না আমাকে দিয়ে গান গাওয়াচ্ছে।

তাই আমার পক্ষে এটা বলা সম্ভব নয়, যে, তাঁর প্রেডিকশন আমি কতটা মিলিয়ে দিতে পেরেছি। বরং, আমি একটা কথাই বলব, প্রেডিকশন মাপবার একটাই উপায় ছিল, আয়ুব বাচ্চুর সামনে উপস্থিত হওয়া। এবং, তাঁর থেকে আরও খানিকটা অনুপ্রেরণা ও উদ্দীপনা শুষে নেওয়া। সেটা একটা বড় সহায় ছিল আমার।

আপনি যখন আজ থেকে এক দশক আগে মঞ্চে দাঁড়িয়ে 'সেই তুমি' গেয়েছিলেন, যাঁরা জানতেন না, তাঁরা ভাবতেই পারেননি, ওটা আপনার গান নয়। গানটা আপনি এমনভাবেই গাইছেন, যেন ওটা আপনার গান।  NDTV'কে দেওয়া সাক্ষাৎকারেই আপনি একবার বলেছিলেন, আপনার শো'তে উপস্থিত প্রত্যেকটি মানুষ একটা সময়  পর কোথাও গিয়ে নিজেই হয়ে যান মঞ্চ। নিজেই নিজের মতো করে গেয়ে যান গানটি। নিজেই করেন নিজের মতো করে হেডব্যাং। অর্থাৎ, আপনার শো'এর অতি কোণে থাকা কোনও দর্শকও কিন্তু একটা সময় পর আসলে রূপম ইসলাম। এটা একটি ব্যাপার। আর, ঠিক কোন জায়গা থেকে এমন একটি বিস্ফোরণ ঘটে যেখান একজন সম্পূর্ণ মৌলিক গায়ক তাঁর জনপ্রিয়তম শো'গুলোতে অন্য একজন গায়কের একটি গান গাইছেন, অথচ মানুষ ভাবছে সেটা ওই শিল্পীর গান। একের গান কখন অপরের হয়ে যায়?

কোনও গান যখন আমি গাইছি, তখন তা যদি আমি নিজের বলে ভাবতে না পারি, তাহলে গানটি গাওয়া সম্ভব হয় না। 'সেই তুমি' ছাড়াও  আয়ুব বাচ্চুর বহু গান আমি গেয়েছি। আর কত বিভিন্নসময়ে কত ভিন্ন ভিন্ন মানসিক অবস্থার মধ্যে  গুনগুন করেছি তাঁর আরও কত গান! বিশেষ করে 'ফেরারী মন' অ্যালবামটি ভীষণ প্রিয় অ্যালবাম আমার। যেটি এই সেদিনও ছেলেকেও শুনিয়েছি। আনপ্লাগড রক গানের অ্যালবাম। উদাত্ত কণ্ঠে প্যাশনেট গলায় অন্য ধরনের রোম্যান্স তৈরি করে আয়ুব বাচ্চু গাইছেন। প্রেমের গান, যন্ত্রণার গান, বিরহের গান, কষ্টের গান। কয়েকদিন আগে একটি ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় আমার স্ত্রী'কে লিখেছিলেন , 'আমার প্রিয় পুত্রসম পাগল (আমাকে 'পাগল' বলে ডাকতেন মাঝেমাঝে) আর তোমাকে নিয়ে আকাশের তলায়, তারাদের তলায় বসে অনেক কথা বলব। আমার যন্ত্রণার কথা বলব। আমি নিশ্চিত তোমাদের চোখও জলে ভরে আসবে।' এই যে আলাপচারিতা, এটা কিন্তু প্রায় আমার গানের ‘মানসী'র সঙ্গে আলাপচারিতা, যা এখনও শেষ হয়নি। ওঁকে কী বলব? 'মানসপিতা' বলব। উনি বলছেন, আমরা কথা বলব। আমরা ব্যথার কথা বলব। যন্ত্রণার কথা বলব...শেয়ার করব। এই কথাগুলো আমরা গানের মাধ্যমেও বলছি। একে অপরের সঙ্গে কথা বলছি একে অপরের গান গাওয়ার  মাধ্যমে। এভাবেই তো একটি গান একের থেকে অপরের কাছে পৌঁছে যায়, তাঁরও হয়ে যায়।

আয়ুব বাচ্চুকে এপার বাংলার বহু শ্রোতাদের কাছে আপনিই প্রথম পৌঁছে দিয়েছিলেন...আপনার বাড়িতে উনি শেষবার যখন এসেছিলেন, সামনে কিছু খাবার, আসলে যেন কিছুই নেই, আপনারা গিটার গিটার গিটার বাজাচ্ছিলেন...আয়ুব বাচ্চু ঠিক কোন মুহূর্ত থেকে রূপম ইসলামের 'বাচ্চু ভাই' হয়ে গিয়েছিলেন?

দুজন শিল্পী যখন সামনাসামনি বসেন, তাঁদের মধ্যে একটা মানসিক যোগাযোগ ঘটে। সেটাই একটি বড় আকর্ষণ যার কারণে একে অপরের কাছাকাছি চলে আসেন তাঁরা। যে সমস্ত ব্যক্তির বিশেষ স্নেহ ও আশীর্বাদ আমার জীবনে এসেছে...আমি গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের কথা বিশেষভাবে বলতে চাই। যেভাবে আমি ঢুকে পড়েছিলাম আমার গান নিয়ে তাঁর সংসারে...গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের প্রেডিকশন ছিল আমার সম্পর্কে- ব্লু আইড বয় অব বাংলা রক...মাকসুদ হকের কথা অবশ্যই বলব। বাংলায় যে এ ধরনের গান সম্ভব সেটা তাঁর ব্যান্ডের গান শুনে আমি বুঝতে পারি প্রথম। তারপর আসেন সুমন। বাংলায় আমি যে ধরনের গান লিখেছি, এঁরা তার ধ্রুবতারা। মাকসুদ ভাই বা ম্যাকদা'র সঙ্গে যখন আমার আলাপ হয়...আমি বাংলাদেশের গান নিয়ে কাজ করার সময় তাঁর একটা সাক্ষাৎকার নিতে গিয়েছিলাম। এই আপনি যেটা বললেন, সামনে আর কিচ্ছু নেই, কেবল গিটার। সাক্ষাৎকার দিতে গিয়েও কিন্তু তাই হচ্ছে। শুধু গিটার। শুধু গান। শুধু শিল্প। এর মধ্যেই আমরা ধাক্কা খাচ্ছি। আমার প্রশ্নে উনি ধাক্কা খাচ্ছেন। ওঁর উত্তরে আমি ধাক্কা খাচ্ছি। এটা কিন্তু একটি মজাদার সংঘাত। এই পরম্পরাতেই কবীর সুমনের সঙ্গে আমার যোগাযোগ। সামনাসামনি কিছু হয়েছে। পরবর্তীকালে হোয়াটসঅ্যাপে প্রচুর আলাপচারিতা হয়েছে আমার তাঁর সঙ্গে। সেই আলাপচারিতা চলবে কী করে? যদি তার মধ্যে রসদ না থাকে? বারবার কিন্তু এই স্নেহ, এই প্রেরণা আমি গুণী মানুষদের কাছ থেকে পেয়েছি। আরও অনেকের কথাই বলতে পারি এই প্রসঙ্গে। আয়ুব বাচ্চুর সঙ্গেও এই একইরকমের একটি জোনে আমি যেতে পেরেছিলাম। এর মধ্যে আমার কোনও বাহাদুরি নেই। এগুলো সবই তাঁদের আমাকে চয়ন করে নেওয়া, আমাকে আস্কারা দেওয়া, আমাকে সহ্য করে নেওয়া। আয়ুব বাচ্চুর সঙ্গে কোনও ফরম্যাল সাক্ষাৎকার নেওয়ার জন্য কিন্তু প্রথম আলাপ নয়। অনেক পরে আমি তা নিয়েছি। বিরাট সাক্ষাৎকার নিয়েছি। ইনফরম্যাল কথা থেকে ফরম্যাল কথা হয়ে আবার ইনফরম্যাল কথায় পৌঁছানো...এই যে জার্নিটা, এটা পুরোটাই ঘটছে, কারণ, দুটো মন, একে অপরকে খুঁজছে। সেখানে আমার যে মন, যাকে চয়ন করা হল, সে হয়তো খুব একটা আমিও নয়। কিন্তু আমার মধ্যে জেগে থাকা পরিব্রাজক মনটাকে এই জার্নিটার মধ্য দিয়ে চিনে নিচ্ছেন উচ্চস্তরের কোনও শিল্পী। উচ্চস্তরের একজন শিল্পী। যার নাম- আয়ুব বাচ্চু।  একটা সংবেদনশীল, অনুসন্ধিৎসু, চির কৌতূহলী, অবিরত শিক্ষার্থী এবং সঙ্গীতের বা শিল্পের শ্রমিক- এমন কোনও মনকে যে কোনও প্রকৃত শিল্পীই বোধহয় খুঁজে পেতে চান সবসময়। এগুলো আমি সবই ধরে নিচ্ছি। জানি না। কিন্তু আমি জানি যে, আমি কী খুঁজি। এটা হতেও পারে, আমার মধ্যে আয়ুব বাচ্চু একজন নবীন শিল্পীর মনের খোঁজটি পেয়েছিলেন। সেই কারণেই তিনি নিজেকে অ্যালাউ করেন আমার পরমপ্রিয় 'বাচ্চু ভাই' হতে।

আপনার কাছে এটা শেষ প্রশ্ন, রূপমদা। বহু মানুষ আপনাকে একটা সময় অদ্ভুত খারাপভাবে অপমান করেছে। আপনি এখন সাফল্যের শীর্ষে। আয়ুব বাচ্চুর গানের রেশটি টেনেই বলি, এই রাতটিতে একটি খোলা জানলার দিকে তাকালে আপনি কোন কথাগুলো বলবেন?

'সাফল্যের শীর্ষ'  বলে আসলে কোনও কথা হয় না। যেমন অতীত বলে কিছু হয় না। ভবিষ্যত বলে কিছু হয় না। সবটাই বর্তমান। আর বাইরে থেকে দেখে তো তা আরও বলা যায় না। বাইরের লোক তো জানে না, আমার ভিতরে এখন একজন শিল্পী হিসেবে ঠিক কোন প্রক্রিয়া চলছে। বা, আমার ভবিষ্যতের কাজটা কী হতে যাচ্ছে। বাইরের লোক আমাকে বিচার করবে আমার অতীতের কাজগুলো দিয়ে। তাই সেগুলো দিয়ে তারা যদি ভাবে 'সাফল্যের শীর্ষ', তবে সেটা তাদের ব্যক্তিগত মতামত। আমার কাছে অতীত নিরর্থক। তবে প্রত্যেকেরই ব্যক্তিগত মতামত থাকতে পারে। অন্য যে প্রসঙ্গটির উল্লেখ আপনি করলেন, তা হল- অপমান। সম্মান এবং অপমান- এই দুটি ব্যাপার নিয়ে, বিশেষ করে যাঁদের দিকে বহু মানুষ চেয়ে আছেন, তাঁদের দৈনন্দিন সহাবস্থান করতে হয়। আমি যতদূর জানি বা বুঝি, আমাকে আজকেও প্রতিনিয়ত প্রশংসিত ও অপমানিত হতে হয়। এই তো, সোশ্যাল নেটওয়র্কিং সাইট গুলোতেও মানুষ বিনামূল্যে অপমান করে যান, যেমন বহু মানুষ সম্মানও করেন! এই মুহূর্তে আমি একটি বই পড়ছি, সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখা। আ সেঞ্চুরি ইজ নট এনাফ। সেখানে সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় এক জায়গায় লিখছেন, আপনার কাজ যদি মানুষের নজরে পড়ে, নজরকারা কাজ যদি কিছু করেন, যদি আপনার কাজ অনেক মানুষকে প্রভাবিত করে, তাহলে আপনার কাজ নিয়ে আলোচনা হবেই। সমালোচনা আর প্রশংসা দুইই আসবে। এটাই নিয়ম। আমার 'স্তব্ধ জীবন' গানটিতে আমি লিখেছিলাম- 'গানে কেউ শুধু বিনোদন খোঁজে, আমি খুঁড়ি যন্ত্রণা, ফেলে ডাস্টবিনে যত উপদেশ আর স্তোকের আবর্জনা, শিকড়বিহীন মানুষকে তুমি রূপকথা শুনিয়ো না'। এই প্রসঙ্গে দ্বিতীয় লাইনটি গ্রহণযোগ্য। আমার মধ্যে যদি কিছু সৃষ্টি করার ক্ষমতা থাকে, তাহলে অন্যের উপদেশ দ্বারা তা নিয়ন্ত্রিত নয়। উপদেশ সাহায্য করতে পারে অবশ্যই।  যার থেকে সেই উপদেশটা পাচ্ছি, তিনিও সৃষ্টিশীল মানুষ কী? যদি সেই সৃষ্টি আমাকে অনুপ্রেরণা দেয়, তাহলে তাঁর সেই উপদেশ আমার কাজে লাগবে। নয়তো, লাগবে না। আর, স্তোক অর্থাৎ প্রশংসা? এটা লাগবেই না। তবে, প্রশংসা একটা স্থানে অ্যান্টিডোটের কাজ করে। যে আঘাতগুলো আসে, যে অপমানগুলো আসে, তার মলম হিসেবে প্রশংসা খানিকটা কাজ করে। তাছাড়া কিন্তু প্রশংসার কোনও কাজ নেই। প্রশংসা এই জায়গাটাতেই কেবল একটা ঢাল হয়ে দাঁড়ায়। অপমানের হুল ফুটল। আর, প্রশংসা তাতে একটা মলম লাগাল। এইটুকুই। কিন্তু দুটোই আসতে থাকবে। তোমার যে কাজ, তাতে তো তুমি অটল থেকে যাবে। তোমার যে কাজটা তুমি আগে করেছিলে, সেটা পরেও করে যাবে। যে সমস্ত সমান্তরাল শিল্প বা জীবন থেকে তুমি রসদ সংগ্রহ করছ...আমার ক্ষেত্রে, যে বইটি আমি এখন পড়ছি বা পরে পড়ব বা আগে পড়েছিলাম...এগুলো সবই আমার রসদ। আমার শিক্ষাব্যবস্থা। এটা আমার পক্ষে খুব গর্বের বিষয় যে, আয়ুব বাচ্চুকে আমি আমার শিক্ষাব্যবস্থার অঙ্গ হিসেবেই পেয়েছিলাম। আয়ুব বাচ্চুকে আমি আমার সিলেবাসে পেয়েছিলাম... আমার নেওয়া আয়ুব বাচ্চুর দীর্ঘ সাক্ষাৎকারের শিরোনাম ছিল- Enter & Exit! এক কান দিয়ে শুনে অন্য কান দিয়ে বের করে দাও... তা হলেই দেখুন, একই কথা তিনিও বলে গেলেন।


বাংলা ভাষায় বিশ্বের সকল বিনোদনের আপডেটস তথা বাংলা সিনেমার খবর, বলিউডের খবর, হলিউডের খবর, সিনেমা রিভিউস, টেলিভিশনের খবর আর গসিপ জানতে লাইক করুন আমাদের Facebook পেজ অথবা ফলো করুন Twitter আর সাবস্ক্রাইব করুন YouTube
Advertisement
Advertisement
Listen to the latest songs, only on JioSaavn.com